সাত বছর বয়সে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল শিশুটি। মামলার শুনানিতে তার একটাই আবেদন ছিল—যে ব্যক্তিকে সে ‘আঙ্কল’ বলে ডাকত, তিনি যেন আর জেল থেকে বেরোতে না পারেন। সেই আবেদন শুনেছিল দিল্লির রোহিণী আদালত। অভিযুক্তকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়ার পর বিচারক রাজনি রঙ্গা (Rajni Ranga) রায়ের শেষ অংশে সরাসরি ওই শিশুটির উদ্দেশে একটি চিঠিও লেখেন। এবার সেই বার্তা এবং নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের টাকা শিশুটির কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিল দিল্লি হাই কোর্ট (Delhi High Court)।
ঘটনাটি ২০২৩ সালের ২৩ জুলাইয়ের। তখন শিশুটির বয়স ছিল সাত বছর। মামলায় সুমিত শাক্যকে ১২ বছরের কম বয়সি শিশুর উপর গুরুতর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় POCSO আইনে দোষী সাব্যস্ত করে রোহিণী আদালত। একই মামলায় অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগেও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। যৌন অপরাধের জন্য তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়।
সাজার নির্দেশের শেষে বিচারক রাজনি রঙ্গা প্রচলিত আইনি ভাষার বাইরে গিয়ে শিশুটিকে উদ্দেশ করে একটি ব্যক্তিগত বার্তা লেখেন। সেখানে তিনি জানান, আদালত শিশুটির আবেদন শুনেছে এবং তার কথার ভিত্তিতেই অভিযুক্তকে জীবনের বাকি সময় কারাগারে থাকার সাজা দেওয়া হয়েছে। বিচারকের বার্তায় শিশুটিকে ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর কথাও বলা হয়।
বিচারক শিশুটিকে স্কুলে যেতে, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে, হাসতে, খেলতে এবং নিজের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে বলেন। অর্থাৎ, রায়ের কঠোর আইনি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি শিশুটির স্বাভাবিক জীবন ও ভবিষ্যতের কথাও আলাদা করে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
এই বার্তাকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে দিল্লি হাই কোর্ট। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর নির্দেশে বিচারপতি প্রতিভা এম সিংহ (Prathiba M Singh) এবং বিচারপতি দীনেশ ভট্টের (Dinesh Bhatt) ডিভিশন বেঞ্চ উত্তর-পশ্চিম দিল্লির জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (DLSA)-কে বিচারকের লেখা বার্তাটি ছাপিয়ে শিশুটির হাতে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
শুধু চিঠি নয়, শিশুটির পরিবারকে দেওয়া ১০.৫০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ট্রায়াল কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী এই ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছিল শিশুটি ও তার পরিবারের উপর ঘটনার প্রভাব বিবেচনা করে। হাই কোর্ট DLSA-র কাছে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে কি না, সেই সংক্রান্ত রিপোর্টও চেয়েছে।
অভিযুক্ত সুমিত শাক্য সাজা স্থগিত করে জামিনের আবেদন করেছিলেন। তবে এই পর্যায়ে সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি হাই কোর্ট। মামলার প্রমাণ, ফরেন্সিক তথ্য-সহ নথি বিবেচনা করে আদালত সাজা স্থগিত করার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও স্বস্তি দেয়নি। অভিযুক্তের দায়ের করা আপিলের আইনি প্রক্রিয়া অবশ্য চলবে।
হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, বিচারকের বার্তা এবং ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে DLSA-কে দুই সপ্তাহের মধ্যে পদক্ষেপ করতে হবে। ক্ষতিপূরণের অগ্রগতি নিয়ে পরবর্তী শুনানি ৪ নভেম্বর ২০২৬ এবং মূল আপিলের পরবর্তী তালিকা ২০ জানুয়ারি ২০২৭ নির্ধারিত হয়েছে।
এই মামলায় তাই নজরে এসেছে শুধু আমৃত্যু কারাদণ্ডের সিদ্ধান্ত নয়, সাজা ঘোষণার পর একজন বিচারকের লেখা সেই ব্যক্তিগত বার্তাও। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই শিশুটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার যে বার্তা দেওয়া হয়েছিল, দিল্লি হাই কোর্ট সেটিই এখন তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে।



