আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টে বড় তিন মামলা, অভিবাসী আটক থেকে স্কুলে ‘টেন কম্যান্ডমেন্ট’—নজরে জুয়াও

নতুন বিচারবর্ষে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সামনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন—ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি, prediction market-এর নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি স্কুলে Ten Commandments প্রদর্শন নিয়ে মামলা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

আমেরিকার নতুন বিচারবর্ষ শুরুর আগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার দিকে নজর রয়েছে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের জামিনের সুযোগ ছাড়াই আটক রাখা, Kalshi ও Polymarket-এর মতো prediction market-কে জুয়া হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে কি না এবং টেক্সাসের সরকারি স্কুলে ‘Ten Commandments’ প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার আইন—এই তিনটি বিষয়ে আদালত মামলা গ্রহণ করবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে চলতি সপ্তাহেই।

আগামী সোমবার থেকে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের নতুন নয় মাসের বিচারপর্ব শুরু হচ্ছে। Reuters-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণত একটি বিচারবর্ষে আদালত প্রায় ৭০টি মামলা শুনে থাকে। ইতিমধ্যেই নতুন মেয়াদের প্রায় দুই ডজন মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা এখন বিচারপতিদের বিবেচনায় রয়েছে।

এর মধ্যে অভিবাসন-সংক্রান্ত মামলাটি সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির সঙ্গে যুক্ত। প্রশাসন চায়, অভিবাসন দমন অভিযানে গ্রেফতার হওয়া কিছু ব্যক্তিকে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা চলাকালীন বন্ড বা জামিনের শুনানির সুযোগ না দিয়েই আটক রাখা হোক। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বহু বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করলেও এই নীতি কার্যকর রাখার পক্ষে প্রশাসনের অবস্থান রয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘applicant for admission’ শব্দবন্ধটির আইনি ব্যাখ্যা। মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক দফতর (ICE) গত বছর অবস্থান নেয়, আমেরিকায় আগে থেকেই বসবাসকারী কিছু অ-মার্কিন নাগরিককেও এই শ্রেণির আওতায় ফেলা যেতে পারে। সেই ব্যাখ্যা গ্রহণের পর অভিবাসন বিচারকেরা বাধ্যতামূলক আটকাদেশ দিতে শুরু করেন।

তবে নিম্ন আদালতগুলিতে এই অবস্থান একাধিকবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। টেক্সাসের অভিবাসন আইনজীবী কেমাল হেপসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, ফেডারেল আপিল আদালতের ১১টি রায়ের মধ্যে ৯টিতেই প্রশাসন হেরেছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট এই আইনি প্রশ্নে হস্তক্ষেপ করে কি না, সেটিই দেখার।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই prediction market নিয়ে। Kalshi ও Polymarket-এর মতো প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন রাজনৈতিক, ক্রীড়া ও অন্যান্য ঘটনার সম্ভাবনা নিয়ে আর্থিক চুক্তি করা হয়। এই প্ল্যাটফর্মগুলির দাবি, তাদের ‘event contracts’ আর্থিক derivative এবং এগুলি নিয়ন্ত্রণের অধিকার ফেডারেল Commodity Futures Trading Commission-এর হাতে থাকা উচিত।

অন্যদিকে, একাধিক মার্কিন অঙ্গরাজ্যের জোটের দাবি, বিশেষ করে ক্রীড়া-ভিত্তিক এই ধরনের চুক্তি আসলে জুয়ার আওতায় পড়ে। ফলে সেগুলির ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যের sports betting সংক্রান্ত আইন কার্যকর হওয়া উচিত। এই বিষয়ে বিভিন্ন ফেডারেল আপিল আদালতের রায়ও পরস্পরের সঙ্গে একমত নয়।

সুপ্রিম কোর্ট যদি শেষ পর্যন্ত prediction market-কে জুয়ার আওতায় ফেলার পক্ষে রায় দেয়, তা হলে এই সংস্থাগুলিকে একাধিক রাজ্যে আলাদা নিষেধাজ্ঞা, কর, লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং এমনকি ফৌজদারি আইনের মুখোমুখি হতে হতে পারে। ফলে মামলাটির প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।

তৃতীয় বড় বিতর্ক ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় বক্তব্যের উপস্থিতি নিয়ে। টেক্সাসের কয়েকটি পরিবার, American Civil Liberties Union (ACLU)-এর সমর্থনে, সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। তাদের আপত্তি ২০২৫ সালের টেক্সাসের সেই আইনের বিরুদ্ধে, যাতে সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বাইবেলের ‘Ten Commandments’ প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে নিউ অরলিন্স-ভিত্তিক Fifth US Circuit Court of Appeals জানিয়েছিল, এই আইন মার্কিন সংবিধানের First Amendment-এর ধর্ম প্রতিষ্ঠা নিষিদ্ধ করার বিধান বা ধর্ম পালনের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। সেই রায়ের পরই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছেছে।

বিতর্কটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ ১৯৮০ সালে Stone v. Graham মামলায় সুপ্রিম কোর্ট কেনটাকির একই ধরনের একটি আইন বাতিল করেছিল। তবে ২০২২ সালের একটি মামলায় ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত আইনি কাঠামো বদলে যাওয়ার পর বর্তমান আদালত সেই পুরনো নজিরকে কীভাবে বিবেচনা করবে, তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

লুইজিয়ানা, আরকানসাস, টেক্সাস ও আলাবামা-সহ দক্ষিণের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সরকারি স্কুলে Ten Commandments প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লুইজিয়ানার আইন নিয়েও আইনি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে টেক্সাসের মামলাটি গ্রহণ করা হলে তার প্রভাব অন্য রাজ্যের আইনেও পড়তে পারে।

এই তিনটি মামলার পাশাপাশি নতুন বিচারবর্ষের শুরুতেই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা শুনবে সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে ExxonMobil-এর মতো তেল সংস্থাগুলিকে জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকার জন্য আর্থিকভাবে দায়ী করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন উঠবে।

অর্থাৎ নতুন বিচারবর্ষে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সামনে অভিবাসন নীতি, অনলাইন prediction market, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জলবায়ু-দায়বদ্ধতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। চলতি সপ্তাহে কোন কোন মামলা আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে শুনবে, সেই সিদ্ধান্তগুলিই পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের দিক নির্ধারণ করবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন