নজরবন্দি ব্যুরো: পুলিশ হেফাজতে এক তৃণমূল কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ায়। মৃতের নাম বিরজু কেওট ওরফে বিরজু কুমার। অস্ত্র আইন ও মারধরের মামলায় গ্রেফতারের পর আদালতের নির্দেশে পুলিশ হেফাজতে ছিলেন তিনি। শনিবার সকালে লকআপে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অবশ্য অভিযোগ, রাতে পুলিশ হেফাজতে তাঁকে মারধর করা হয়েছিল।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তোলাবাজি ও মারধরের একাধিক অভিযোগের তদন্তে শুক্রবার বিরজু কেওট এবং সোমনাথ গাঙ্গুলিকে গ্রেফতার করে হালিশহর থানার পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন-সহ একাধিক ধারায় মামলা করা হয়।
গ্রেফতারের পর দু’জনকেই ব্যারাকপুর আদালতে পেশ করা হয়েছিল। আদালত তাঁদের পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। এরপর তাঁদের কাঁচরাপাড়া থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে।
পুলিশের দাবি, শনিবার সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ লকআপের মধ্যে আচমকাই মাথা ঘুরে পড়ে যান বিরজু। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দ্রুত তাঁকে কল্যাণীর জেএনএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। প্রাথমিক ভাবে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তের আওতায় রয়েছে।
খবর পৌঁছতেই হাসপাতালে ছুটে আসেন বিরজুর পরিবারের সদস্যরা। সেখানে উপস্থিত হন তাঁর স্ত্রী জেনি শর্মা, যিনি কাঁচরাপাড়া পুরসভার ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলর।
জেনির দাবি, শুক্রবার রাতেও স্বামীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। তখন বিরজু সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন বলেই দাবি তাঁর। পরিবারের অভিযোগ, রাতে পুলিশ হেফাজতে তাঁকে মারধর করা হয়েছিল এবং সেই কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
এই অভিযোগ ঘিরে ইতিমধ্যেই তদন্তের দাবি উঠেছে। জেনি শর্মা কল্যাণী থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গিয়েছে। তবে পুলিশের তরফে এখনও পর্যন্ত পরিবারের অভিযোগ নিয়ে কোনও বিস্তারিত বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, পুলিশ হেফাজতে বন্দির মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছন পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা। ডিসিপি এবং এসিপি পদমর্যাদার আধিকারিকেরা কাঁচরাপাড়া থানায় গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন।
লকআপে কী ঘটেছিল, তা জানতে সিসিটিভি ফুটেজও পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা এক পুলিশকর্মীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। তবে ওই পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে ঠিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনও সামনে আসেনি।
ঘটনার জেরে কাঁচরাপাড়া ও বিস্তীর্ণ বীজপুর এলাকায় রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে। বিরজু কেওট স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং কাঁচরাপাড়া পুরসভার প্রাক্তন পুরপ্রধান কমল অধিকারীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
বিরজুর বিরুদ্ধে আগে একাধিক অভিযোগ ছিল বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু সেই মামলায় গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতেই তাঁর মৃত্যু হওয়ায় এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লকআপে তাঁর শেষ কয়েক ঘণ্টার পরিস্থিতি।
পরিবারের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যের মধ্যে যে ফারাক তৈরি হয়েছে, তার নিরসনেই সিসিটিভি ফুটেজ, চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আপাতত বিরজুর মৃত্যুকে ঘিরে কাঁচরাপাড়ায় উত্তেজনা রয়েছে এবং তদন্তের পরেই স্পষ্ট হবে পুলিশ হেফাজতে ঠিক কী ঘটেছিল।



