মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে ফের তীব্র চর্চার কেন্দ্রে হুমায়ুন কবীর। পশ্চিমবঙ্গ দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে বিজেপি মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর উপস্থিতিকে ঘিরে বিস্ফোরক অভিযোগ তুললেন কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। বহরমপুরে সাংবাদিক বৈঠকে তিনি দাবি করেন, আম জনতা উন্নয়ন পার্টি কার্যত বিজেপির মদতেই রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় রয়েছে।
শনিবার মুর্শিদাবাদে আয়োজিত পশ্চিমবঙ্গ দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরকে রাজ্যের মন্ত্রী গৌরী শঙ্কর ঘোষের সঙ্গে দেখা যায়। সেই ঘটনাকেই সামনে রেখে রবিবার অধীর চৌধুরী সরাসরি আক্রমণ শানান হুমায়ুনের বিরুদ্ধে। তাঁর বক্তব্য, মুসলিম ভোটে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যেই বিজেপি হুমায়ুন কবীরকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করছে।
বাবরি মসজিদ নির্মাণের প্রসঙ্গ টেনে অধীর বলেন, বহু প্রচার হলেও প্রস্তাবিত নির্মাণস্থলে এখনও স্পষ্টভাবে কোথাও উল্লেখ নেই যে সেখানে বাবরি মসজিদ তৈরি হবে। তাঁর অভিযোগ, ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়েই রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা চলছে। বিজেপি যেমন হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে প্রভাবিত করছে, তেমনই মুসলিম সমাজে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন হুমায়ুন কবীর।
প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির দাবি, মুর্শিদাবাদের সাধারণ মানুষ অনেক আগেই বুঝে গিয়েছেন যে বাবরি মসজিদ ইস্যুকে সামনে রেখে যে রাজনৈতিক শক্তি গড়ে উঠেছে, তার নেপথ্যে বিজেপির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। একই সঙ্গে দিল্লির রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়েও কটাক্ষ করেন তিনি।
বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গে আরও একধাপ এগিয়ে অধীর বলেন, যে দল অতীতে বাবরি মসজিদ ভাঙার রাজনীতি থেকে ক্ষমতায় উঠেছে, তাদের আমলে নতুন করে ওই মসজিদ নির্মাণের দাবি বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, এই ধরনের প্রতিশ্রুতি সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করার কৌশল মাত্র।
যোগ দিবস নিয়েও বিজেপির সমালোচনা করেন অধীর চৌধুরী। তাঁর বক্তব্য, ভারতে হাজার হাজার বছর ধরে যোগচর্চার ঐতিহ্য রয়েছে এবং এর কৃতিত্ব কোনও রাজনৈতিক দলের নয়। স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বের দরবারে ভারতের যোগ ও আধ্যাত্মিকতার পরিচয় তুলে ধরেছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আগামী রাজ্য বাজেট নিয়ে প্রশ্ন তুলেও অধীর বলেন, নির্বাচনের আগে বিজেপি যে প্রতিশ্রুতিগুলি দিয়েছিল, সেগুলির প্রতিফলন বাজেটে থাকা উচিত। তা না হলে মানুষ প্রতারিত হয়েছেন বলেই ধরে নিতে হবে।
অবৈধ বাংলাদেশি নাগরিকদের ফেরত পাঠানোর প্রসঙ্গেও মন্তব্য করেন কংগ্রেস নেতা। তিনি বলেন, অনুপ্রবেশ রোধ করা প্রয়োজন হলেও তা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক মর্যাদা বজায় রেখেই হওয়া উচিত। ‘পুশব্যাক’ এবং ‘ডিপোর্টেশন’-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলেও তিনি মনে করিয়ে দেন।
এদিকে অধীরের সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। তাঁর বক্তব্য, যদি বিজেপির সঙ্গে কোনও সমঝোতা থাকত, তাহলে সরকার পরিবর্তনের পর তাঁর কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হত না। সরকারি আমন্ত্রণে তিনি পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, এর সঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণের কোনও সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
হুমায়ুন কবীর জানান, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদের শিলান্যাস হয়েছিল এবং নির্মাণকাজ এখনও চলছে। তাঁর আশা, ২০২৮ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হবে। শুধু মসজিদই নয়, ওই চত্বরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে বিজেপির মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সৌমেন মণ্ডল বলেন, পশ্চিমবঙ্গ দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে জেলার সব বিধায়ককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও সৌজন্যের রাজনীতি বজায় রাখার পক্ষেই বিজেপি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ফলে অধীর চৌধুরীর অভিযোগ, হুমায়ুন কবীরের পাল্টা জবাব এবং বিজেপির ব্যাখ্যা— সব মিলিয়ে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক।



