স্পেন থেকে দেশে ফিরেই গ্রেফতার হলেন যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদার। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর গাড়িতে হামলার মামলায় তাঁকে কলকাতা পুলিশের বিশেষ টিম আটক করে। এরপর তাঁকে প্রথমে দিল্লির পটিয়ালা কোর্টে তোলা হয়, পরে আনা হয় কলকাতার আলিপুর আদালতে। এখানেই রাজ্যের পক্ষের আইনজীবী সরাসরি তাঁকে জঙ্গির সঙ্গে তুলনা করে বিস্ফোরক দাবি করেন। যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদার সত্যিই কি ষড়যন্ত্রের মূলচক্রী, নাকি তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক খেলায় বলি হচ্ছেন? এই প্রশ্নে সরগরম রাজ্য।
যাদবপুরে ঘটনাটির প্রেক্ষাপট


ঘটনার সূত্র পয়লা মার্চ। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবকুপার বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু। সেই দিন বাম-অতিবাম ছাত্র সংগঠনগুলি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা সম্মেলনে ভাঙচুর চালায় এবং মন্ত্রীর গাড়ির টায়ার পাংচার করা হয়। এমনকি গাড়ির সামনে বসে বিক্ষোভও চলে। উত্তেজনার মাঝে আহত হন প্রথম বর্ষের ছাত্র ইন্দ্রানুজ রায়, অসুস্থ হয়ে পড়েন শিক্ষামন্ত্রীও। সেই ঘটনার ভিত্তিতেই তিনজন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। এবার যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদার হলেন চতুর্থ গ্রেফতারি।
কে হিন্দোল মজুমদার
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে বি-টেক করে গবেষণার পথে হাঁটেন হিন্দোল। চোখে পড়ার মতো ফলাফল তাঁকে পৌঁছে দেয় স্পেনের গ্রানাডায়, যেখানে তিনি পান মর্যাদাপূর্ণ মারি কুরি ফেলোশিপ। সহপাঠীদের মতে, সাহিত্যপ্রেমী, গিটার বাজানোয় দক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন হিন্দোল ছিলেন প্রাণবন্ত ও মেধাবী। তাঁর বাবা চন্দন মজুমদার যাদবপুরের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনি ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, “যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদার বিদেশে পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলেন, ষড়যন্ত্র করার প্রশ্নই ওঠে না।”


আলিপুর আদালতে বিস্ফোরক বিতর্ক
বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতারের পর শুক্রবার কলকাতায় এনে আলিপুর আদালতে তোলা হয় হিন্দোলকে। পুলিশ ১০ দিনের হেফাজতের আবেদন জানায়। অন্যদিকে তাঁর আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন। প্রতিরক্ষা আইনজীবীর বক্তব্য, ঘটনার দিন থেকে কয়েকদিন ধরে মোট ১৮ জনের নাম মামলায় উঠে এলেও, যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদারের নাম কোথাও ছিল না। তবু লুক আউট নোটিস জারি করে তাঁকে গ্রেফতার করা হল।
রাজ্যের আইনজীবী অবশ্য দাবি করেন, লুক আউট নোটিস পুলিশ সুপারই জারি করতে পারেন। তাঁর যুক্তি, হিন্দোলের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ রয়েছে, এমনকি জাতীয় পতাকা অবমাননার অভিযোগও তোলা হয়। এখানেই রাজ্যের আইনজীবী আফতাব আনসারির উদাহরণ টেনে এনে বলেন, “যেমন দুবাইয়ে বসে কলকাতার আমেরিকা সেন্টার হামলার ছক কষেছিলেন আফতাব, তেমনি বিদেশে বসেই পরিকল্পনা করেছিলেন হিন্দোল।” আদালত আপাতত তাঁকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
এই গ্রেফতারি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত। শাসক শিবির দাবি করছে, পুলিশ যথাযথ তথ্যের ভিত্তিতেই পদক্ষেপ করেছে। অন্যদিকে বিরোধী মহল মনে করছে, যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদার বৃহত্তর রাজনীতির শিকার। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু নিজে অবশ্য জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। কিন্তু তৃণমূলের কুণাল ঘোষ বলছেন, পুলিশের হাতে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
অন্যদিকে, হিন্দোলের পরিবার ও সহপাঠীরা বলছেন, একজন আন্তর্জাতিক ফেলোশিপধারী গবেষককে জঙ্গির সঙ্গে তুলনা করা অমানবিক। তাঁর বাবা চন্দন মজুমদার স্পষ্ট বলেছেন, “এটা গল্প তৈরি ছাড়া কিছু নয়।”
যাদবপুর গবেষক হিন্দোল মজুমদার কি সত্যিই ষড়যন্ত্রের মূলচক্রী? নাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে তিনি বলির পাঁঠা হচ্ছেন? এখন আদালত এবং তদন্তই ঠিক করবে, কোনটা সত্যি। তবে এই ঘটনা বাংলার শিক্ষাঙ্গন ও রাজনীতিকে নতুন করে নাড়া দিয়েছে, তা বলাই যায়।







