দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। বছরের পর বছর বন্যার আতঙ্কে দিন কাটানো ঘাটালবাসীর জন্য বুধবার এক ঐতিহাসিক দিন। সিঙ্গুরের সভামঞ্চ থেকে ভার্চুয়ালি ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা না পেলেও রাজ্যের নিজস্ব উদ্যোগে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পের সূচনা হয়। এই মুহূর্তে সবচেয়ে আবেগপ্রবণ ছিলেন ঘাটালের সাংসদ দেব—যিনি নিজেই ছোটবেলা থেকে বন্যাকবলিত ঘাটালের সাক্ষী।
মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে আবেগ চেপে রাখতে পারেননি দেব। হাতজোড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন,
“আজ দিদি যে কাজটা করলেন, এটা কোনও সোজা ব্যাপার নয়। ঘাটালের মানুষ ভেবেছিলেন, এমন কেউ আসবেন যিনি আমাদের দুঃখ বুঝবেন। আমি প্রথমবার সাংসদ হিসেবে শপথ নেওয়ার দিনই বাংলায় ঘাটালের কথা বলেছিলাম। দিল্লিতে বৈঠক করেছি, দরজায় দরজায় ঘুরেছি। কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। যিনি কথা রেখেছেন, তিনি মুখ্যমন্ত্রী।”
দেবের বক্তব্যে উঠে আসে দীর্ঘ প্রশাসনিক উদাসীনতার ছবিও। তাঁর কথায়,
“এই ফাইলটা প্রতিটি সরকার, প্রতিটি দফতরের টেবিলে ঘুরেছে। কিন্তু কেউ কাজ করেনি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ—একটা কথা বললেই ট্রোল করা হয়। কিন্তু যে সরকার ভোটের পরেও কথা রাখে, মানুষ তাকেই ভোট দেয়। আজ আমি ভোট চাইতে আসিনি। আজ আমার গর্বের দিন।”
তিনি মুখ্যমন্ত্রী ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-কে ধন্যবাদ জানান ঘাটালবাসীর পক্ষ থেকে।
ঘাটাল এলাকার বন্যা সমস্যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। শীলাবতী, কংসাবতী ও দ্বারকেশ্বর নদীর শাখা নদী ঝুমির অববাহিকায় অবস্থিত এই অঞ্চল ব্রিটিশ আমলের জমিদারি ব্যবস্থার সময় গড়ে ওঠা সার্কিট বাঁধের উপর নির্ভরশীল। জমিদারি প্রথা উঠে গেলেও সেই বাঁধগুলি আজও রয়ে গিয়েছে—কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলি ভঙ্গুর। প্রতি বছর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা।
অন্যদিকে, নদীতে জমে থাকা পলি মাটি জলধারণ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে বহু গুণ। ফলে সামান্য বৃষ্টি বা জোয়ারেই ঘাটাল কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবেই পরিকল্পিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। রাজ্যের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কারণেই এতদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি।
সেই কারণেই জমি আন্দোলনের আঁতুড়ঘর সিঙ্গুর থেকে এই প্রকল্পের উদ্বোধন রাজনৈতিক ও প্রতীকী—দু’দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। উন্নয়নের সঙ্গে আবেগের এই মেলবন্ধন আগামী দিনে ঘাটালের চেহারা কতটা বদলায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে হাজার হাজার মানুষ।



