প্রথম বাম শূন্য বিধানসভা, শত খারাপে আজও মন্দের ভাল ‘কমরেড’ ‘সাথী’ ‘বন্ধু’ #Editorial

প্রথম বাম শূন্য বিধানসভা, শত খারাপে আজও মন্দের ভাল 'কমরেড' 'সাথী' 'বন্ধু' #Editorial
প্রথম বাম শূন্য বিধানসভা, শত খারাপে আজও মন্দের ভাল 'কমরেড' 'সাথী' 'বন্ধু' #Editorial

অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি): প্রথম বাম শূন্য বিধানসভা, এমন দিন দেখতে হবে কখনও ভাবিনি। ছোটবেলায় বাড়ির বড়রা যখন দেওয়াল লিখতে বেরত তখন পিছনে পিছনে ঘুরতাম একবার যদি তুলিটা হাতে পাই! কেউ দিতনা। বয়েস তখন কত হবে ৫-৬। হয়তো ক্লাশ ওয়ান। সময়টা সঠিক মনে নেই, তবে এটুকু মনে আছে দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন পিভি নরসীমা রাও। আমাদের বাড়ি গ্রামে, মফঃস্বল থেকেও অনেক অনেক ভেতরে।

রেডিওতে যখন ভোট গননার খবর আসত তখন উলুবেড়িয়া লোকসভার ফল বলা হত সবথেকে শেষে। যাই হোক, দেওয়ালে লিখতে না পারলেও বাবা-কাকা-জেঠুদের রং তুলি দিয়ে বাড়ির দেওয়াল আর জানালায় ফুটিয়ে তুলতাম বিচিত্র রকমের কাস্তে হাতুড়ি, তারাটা বেশ ভালই আঁকতাম। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে যতদূর মনেপড়ে সভা সমিতি মিটিং হলেই বাড়ি থেকে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরা ‘নেতা’ জেঠুরা অনেকটা আমার দাদুর মত দেখতে একটা লোকের ছবি লাগানো ক্যাসেট নিয়ে যেত। সেই ক্যাসেট মাঝে বাড়িতেও বাজত। “আমার প্রিয় নেতা, তোমার প্রিয় নেতা কমরেড জ্যোতি বোস!”

পরে জেনেছিলাম আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর নাম জ্যোতি বসু। ১৯৯৬ সালের লোকসভা নির্বাচনে বদলে গেলেন নরসীমা, কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে থেকেই গেলেন ওই দাদুর মত দেখতে লোকটা, জ্যোতি বসু। এরপরে ৯৮, দেখলাম পাড়ার দেওয়ালে হাত মুখে সেই লোকগুলোই ঘাসফুল আঁকছে। জানলাম কংগ্রেস যুবনেত্রী মমতা ব্যানার্জী দল গড়েছেন নিজের। নাম তৃণমূল কংগ্রেস। তখন নবম শ্রেণী ২০০১ সাল। পড়ার বইয়ের আড়ালে শ্রীকান্ত আর সদ্য প্রকাশিত সুনীল গাঙ্গুলীর প্রথম আলো থেকে চোখ সরত না। চোখ সরতনা আরও একটা জিনিশ থেকে, সেটা লাল ঝাণ্ডা। বাড়িতে গোটা ১০ লাল ঝান্ডা সব সময় দেখতে পেতাম।

রাজ্যে ক্ষমতায় বামফ্রন্ট থাকলেও আমাদের এলাকাটা ছিল দিকশূন্যপুরের মত। পঞ্চায়েত, বিধানসভা সবই ছিল কংগ্রেস পরবর্তী কালে তৃণমূলের দখলে। শুধু আমাদের গ্রামের বুথ দেখলে মনে হত সবুজের সমারোহে যেন একটা মাত্র প্রস্ফুটিত পলাশ গাছ। এরপর হায়ার সেকেন্ড্রারি, কলেজ… রাজনীতি। সেখানেও তারা খচিত শ্বেত পতাকা। ভাল কাজ, খারাপ কাজ সবই দেখেছি পাশাপাশি। দেখেছি অকাল্পক্ক ছাত্র নেতাদের জ্ঞানদা হাবভাব। কিন্তু দেখেছি তাঁদের সাধারণ মানুষের উপকার করার চেষ্টাও।

আজন্ম মনে হত লাল – লাল – আর – লাল, শুধুই লাল ঝান্ডা। ২০০৬ সালের নির্বাচনে যখন বুদ্ধবাবু রেকর্ড আসন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন মনে হত আরও ২৫ বছর। জন্মেছি লাল ঝান্ডার আমলে মৃত্যুও হবে লাল ঝান্ডার আমলেই। অসাধারণ লাগত মানুষটাকে। এখনও ওনার বইগুলো পড়লে মনে হয় এমন উচ্চ-মানের সাহিত্যিক… রাজনীতিতে যদি না আসতেন অনেক লেখা পেতে পারতাম। এদিকে সময় গড়াল, তারপর ধিরে ধিরে কেমন সব বদলে গেল। ছোট বেলায় যে নেতাদের দেখতাম একরকম বড়বেলায় তাঁদের কেমন অন্যরকম দেখাল। বদলে যেতে লাগল সময়। ২০০৯ সাল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী। আমার সাংবাদিকতার প্রথম বছর যখন শেষের পথে প্রথম সুযোগ পেলাম দেখা করার। বলেছিলেন, ২০১১ সালে তৃণমূলের জয় কেউ আটকাতে পারবে না। বিশ্বাস করিনি… বাকিটা ইতিহাস।

২০০৬ সালের ২৩৫, ২০১১ তে নেমে এল মাত্র ৬২ আসনে! জ্ঞান হওয়ার পর প্রথমবার বামফ্রন্ট কে দেখলাম বিরোধী আসনে বসতে। বাবা বলত, বামেদের বিরোধীতা আরও ভয়ঙ্কর। কিন্তু সেই ভয়ঙ্কর রূপ সূর্যবাবুর ৫ বছরে একবারও দেখিনি। বিরোধী বামের ইতিহাস বলতে সেই জ্যোতি বসু। জ্যোতি বসুকে পড়ে জানা, আর সূর্য মিশ্রকে চোখে দেখে। তুলনা করতে চাইনা। বামেদের চরম বিরোধীতার ফসল মিলল ২০১৬ সালের নির্বাচনে। কংগ্রেসের সাথে জোট করে ৬২ আসন নেমে এল ৩২ এ! চলে গেল বিরোধী দলের তকমা। বরং বাম ভোটে জিতে ১৯৭৭ সালের পর ২০১৬ সাথে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেল কংগ্রেস! কেমন বিরোধীতা গত ৫ বছরে হয়েছে সবাই দেখেছেন। মান্নানের হুঙ্কারের থেকে সূর্যের দাপট বেশি ছিল… বাকিটা বুঝে নিন।

এবার ২০২১ সালের নির্বাচন। রাজ্যে নতুন একটি দলে উত্থান হল। নাম আইএসএফ, যার সুপ্রিমো আব্বাস সিদ্দিকি তৃণমূলের সাথে জোট করতে চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হল এবং বাম সেই প্রস্তাব লুফে নিল! বামের নব প্রজন্ম সবসময় সোশ্যাল মিডিয়ায় এগিয়ে থাকে, স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে। ২১ নির্বাচনেও এগিয়ে ছিল। মানে জিতেই গিয়েছিল। কিন্তু কিভাবে সে ব্যাখ্যা কেউ দেয়নি। তৃণমূল যখন সুর চড়িয়েছে বিজেপির বিরুদ্ধে, বামেরা বা সিপিআইএম তখন বলছে আগে তৃণমূলকে হারাতে হবে। তাহলেই বিজেপি হেরে যাবে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, জর্জ বিশ্বাস অজিত পাণ্ডেরা ২১ নির্বাচনে টুম্পা সোনায় হারিয়ে গেছে। সবাই ভাবছিল আধুনিক বাম, আসলে যেটা কেউ ভাবেনি সেটা হল পদস্খলিত নিম্নরুচির বাম। বামপন্থার একটা ঐতিহ্য আছে, ভাষা যতই শক্তিশালী হোক তার রূপাঙ্কন হয় সুরে। তাই টুম্পা সোনা ব্রিগেডে চেন ফ্ল্যাগ লাগিয়ে বাড়ি ফিরে বিজেপি বা তৃণমূল কে ভোট দিয়েছে।

যাইহোক না কেন আশা করেছিলাম কমপক্ষে ৩ জন জিতবে… কিন্তু ৩ জন দ্বিতীয় হয়েছে কিনা সেটাও এখন… এই প্রথম বিধানসভায় বামপক্ষ থাকলেও বামফ্রন্ট নেই। লালদূর্গের পতন শুধু হয়নি, মুছে গিয়েছে। আমার ধারণা এতে বামফ্রন্ট বা সিপিআইএমের যতনা ক্ষতি হয়েছে তার থেকে অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। সেটা সময় এলেই বোঝা যাবে। তবে হতাশ হয়েছি এক সিপিআইএম নেতার কথায়, এক সিপিআইএম রাজ্যস্তরের নেতা ভোটের রেজাল্ট নিয়ে বললেন, সমাজের অবক্ষয় চলছে! মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব। কি বলব ভেবে পেলাম না, কারন এর আগে রাজ্যবাসী এমন সচেতন এবং সুচিন্তিত জনমত প্রকাশ করেছে বলে আমার জানা নেই। অনেকে বলেন নজরবন্দি বামেদের বয়কট করেছিল ২০২১ নির্বাচনে, সেটাও আবার ব্রিগেড মাঠে লাথি খেয়ে! ইতিহাস শুনবেন?

কেন বামেদের ব্রিগেড সমাবেশ বয়কট করেছিলাম? ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড, বাম সমাবেশের আগের রাত। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে নটা। পরের দিন লাইভ কভারেজ হবে, প্রস্তুতি নিচ্ছি। দায়িত্বপ্রাপ্ত ইলেক্ট্রিশিয়ান বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে গেল। ইন্টারনেট কোম্পানি টেনে দিল লাইন। সবই যখন ঠিকঠাক চলছে আচমকাই ২৪-২৫ বছরের কয়েকটা ছেলেমেয়ে এসে আমাদের বিদ্যুতের লাইন খুলে দিল। বললাম তোমারা কারা? লাইন খুলছ কেন? জবাব এল আঙুল তুলে। বলল সিপিআইএম ডিজিটাল, লাইভ করতে তোদের লাগবে না। আমরা নিজেরাই লাইভ সম্প্রচার করব। চল ফোট!

উত্তরে বললাম এভাবে কথা বলছ কেন? সিনিয়ার কাউকে ডাক…. আসরে আবির্ভাব হল এক সিপিআইএম নেতার, নাম সংগ্রাম মুখার্জি। এসে বলল এদের কথাই ফাইনাল আমি কিছু করতে পারব না। রবীন দেব এসে বলল টেবিল গুলো প্রথম এবং দ্বিতীয় ডি পেরিয়ে দর্শকদের কাছে নিয়ে গিয়ে মোবাইল দিয়ে লাইভ করো পারলে! আমি বললাম কিভাবে সম্ভব? ওখানে বিদ্যুতের তার ফেলা যাবেনা। লোকজন থাকবে অনেক। রবীন বলল আমি জানিনা। চলে গেল স্পট থেকে…. কমরেড সংগ্রাম বললেন, সিপিআইএম ডিজিটাল এখন শেষ কথা। ভদ্রভাবে সম্মান নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। বললাম, এভাবে ব্যবহার করছেন কেন? একটু ভাল করেও তো বলতে পারেন? আপনারাও কি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ? ব্যাস আর যায় কোথায়….!

মারমুখী সিপিআইএম ডিজিটালের কিছু জেঠু মার্কা অকালপক্ক ছেলে মেয়ে এগিয়ে এল। বলল চল ফোট, বেরিয়ে যা এখান থেকে। নাহলে ক্যালানি খাবি। আমরা যখন মন খারাপ করে বেরিয়ে আসছি, তখন পেছন থেকে শুনতে পাচ্ছি, এটাই ৭ শতাংশের দম! কি দম আমি বুঝিনি, শুধু দেখেছি মানসদার(সিপিআইএম সমর্থকদের বড় একটি গ্রুপের অ্যাডমিম) চোখে জল, মুখে হতাশা। বামেদের একটি বড় গ্রুপের অ্যাডমিন মানস দে- রাজু দা-রা সাক্ষী আছে ঘটনার। সবথেকে বড় কথা সমর্থকরাই চাঁদা তুলেছিল ব্রিগেড সমাবেশের লাইভ সম্প্রচার করার জন্যে। এমনকি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বনামধন্য বামপন্থী এক আইনজীবীও চাঁদা দিয়েছিল। সব টাকাই জলে গেছে……

আমরা বাম ব্রিগেড প্রত্যাখ্যান করেছিলাম এই কারনেই। যে দল, নেতাদের ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি এরা তেমন নয়। এরা সব জানে, সব বোঝে। বাকি সবাই অশিক্ষিত। নেতারা কেন শূন্য পেলেন পর্যালোচনা করার সময় পারলে এটাও পর্যালোচনা করবেন, এত ঔদ্ধত্ব কেন এবং কিভাবে বাড়ল। প্রশ্ন করবেন এবার থেকে কি ডিজিটালের কমরেডরা বলবেন ‘দেখ সাড়ে ৩ শতাংশের দম?’

প্রথম বাম শূন্য বিধানসভা, তবে এতকিছুর পরেও বলতে চাই, বামশূন্য বিধানসভায় কমরেডদের যতনা ক্ষতি হল তার থেকে অনেক বেশি ক্ষতি হল সাধারণ জনগনের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here