ভারতীয় বায়ুসেনার চাকরি থেকে কর্পোরেট জীবন, তারপর রাজনীতির অন্দরমহলে দ্রুত উত্থান— চন্দ্রনাথ রথের জীবন যেন এক নাটকীয় অধ্যায়। শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ আপ্তসহায়ক হিসেবে গত কয়েক বছরে রাজ্য রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দুর সম্ভাব্য উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার জল্পনার মাঝেই মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ায় আততায়ীদের গুলিতে থেমে গেল তাঁর জীবন।
পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের বাসিন্দা চন্দ্রনাথ রথের জন্ম ১৯৮৪ সালের ১১ অগস্ট। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশোনা শেষ করার পর যোগ দেন ভারতীয় বায়ুসেনায়। পরিবারের সদস্যদের কথায়, তাঁর ইচ্ছে ছিল সন্ন্যাস নেওয়ার। কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরে যায় অন্য পথে।
দীর্ঘ ১৮ বছর ভারতীয় বায়ুসেনায় কাজ করার পর স্বেচ্ছাবসর নেন চন্দ্রনাথ। এরপর কর্পোরেট জগতে পা রেখে ফিউচার গ্রুপে যোগ দেন। তবে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিবারের সম্পর্ক ছিল বহু দিনের। একসময় তাঁর পরিবার তৃণমূল কংগ্রেসের সক্রিয় সমর্থক ছিল। তাঁর মা হাসি রথ পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব সামলেছেন। পরে শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে তিনিও বিজেপিতে যোগ দেন।
শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে চন্দ্রনাথদের পরিবারের যোগাযোগ নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকেই। শুভেন্দু যখন তৃণমূলের সংগঠনে দ্রুত উত্থান ঘটাচ্ছেন, তখন থেকেই তাঁদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে শুভেন্দুর আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন চন্দ্রনাথ।
২০১৯ সালে শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যের মন্ত্রী হওয়ার পর জলসম্পদ দফতরে তাঁর আপ্তসহায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান চন্দ্রনাথ। প্রশাসনিক কাজকর্মে দক্ষতা ও সংগঠনিক তৎপরতার কারণে দ্রুত গুরুত্ব বাড়ে তাঁর। ২০২০ সালে শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরও ছায়াসঙ্গীর মতো তাঁর পাশেই ছিলেন চন্দ্রনাথ। বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দুর দফতরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা ছিল, ভবিষ্যতে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর পদে এলে প্রশাসনিক কাঠামোয় আরও বড় দায়িত্ব পেতে পারেন চন্দ্রনাথ। কিন্তু বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়ায় বাইক আরোহী দুষ্কৃতীদের গুলিতে সেই সম্ভাবনার পথ হঠাৎই থেমে গেল।
চন্দ্রনাথ রথের মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক বৃত্তে এক গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তৈরি করল বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।



