দুর্গাপুজোয় বাঙালির আমিষ খাওয়া নিয়ে বাগেশ্বর বাবার (Dhirendra Krishna Shastri) মন্তব্যের জল এবার গড়াল থানায়। মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বরধামের পীঠাধীশ্বর ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে মঙ্গলবার ভবানীপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করল প্রদেশ কংগ্রেস। অভিযোগকারীদের দাবি, বাংলায় এসে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস এবং দুর্গাপুজোর সংস্কৃতি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে তিনি বাঙালিকে অপমান করেছেন।
মধ্য কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সভাপতি তথা ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চৌরঙ্গির প্রার্থী মানস সরকার অভিযোগটি দায়ের করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের সভাপতি তথা ভবানীপুরের প্রার্থী প্রদীপ প্রসাদ। তাঁদের বক্তব্য, বাঙালির নিজস্ব উৎসব ও সংস্কৃতি কীভাবে পালন করা হবে, তা বাইরের কেউ নির্ধারণ করে দিতে পারেন না।
অভিযোগপত্রে বাগেশ্বর বাবার বক্তব্যের কয়েকটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ‘পাখণ্ডী’ এবং ‘গন্দা গন্দা কুকিং’-এর মতো মন্তব্যের কথা তুলে ধরে পুলিশি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। অভিযোগ দায়েরের সময় ভবানীপুর থানার সামনে কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকেরা জমায়েত হয়ে বিক্ষোভও দেখান।
ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। মুখ্যমন্ত্রীর বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরেই এই অভিযোগ দায়ের হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চর্চা শুরু হয়েছে। কংগ্রেস নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে, শুধু রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে নয়, তাঁরা এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে আইনি পথেই এগোতে চাইছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত দু’দিন আগে হাওড়ার লিলুয়ায় ‘হনুমান কথা’ অনুষ্ঠানে বাগেশ্বর বাবার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। সেখানে দুর্গাপুজোর সময় বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে আপত্তি জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যের মধ্যে পুজোর সময়ে মাছ-মাংস খাওয়া এবং ধর্মীয় আচরণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়েও মন্তব্য ছিল। আমিষভোজীদের ‘পাখণ্ডী’ বা ভণ্ড বলেও তিনি মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ।
এমনকি দুর্গাপুজোর সময় প্যান্ডেলের পিছনে আমিষ রান্না নিয়েও আপত্তি জানান বাগেশ্বর বাবা। নবরাত্রির সময় প্রতিমার পাশে আমিষ খাবার বিক্রি না করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের কাছে আবেদনও করেন তিনি। তাঁর সেই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তরে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
তবে বিজেপির একাধিক নেতা ইতিমধ্যেই এই মন্তব্য থেকে নিজেদের অবস্থান আলাদা করেছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) স্পষ্ট জানিয়েছেন, বাঙালির খাবার নিয়ে কাউকে নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাঙালি যাঁর যা খেতে ইচ্ছে হবে, তিনি সেটাই খাবেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষও (Dilip Ghosh) একই সুরে বাঙালির দীর্ঘদিনের খাদ্যসংস্কৃতির কথা তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ বাগেশ্বর বাবার মন্তব্য নিয়ে বিজেপির মধ্যেই যে অবস্থান এক নয়, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়েছে।
কিন্তু কংগ্রেস এই বিষয়ে আপাতত আরও একধাপ এগিয়েছে। মানস সরকারের অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বাংলায় এসে বাঙালিকে কীভাবে দুর্গাপুজো করতে হবে, কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়—এই ধরনের নির্দেশ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বাংলার সংস্কৃতির প্রতি অবমাননাকর।
কংগ্রেস নেতৃত্ব আরও অভিযোগ করেছে, আমিষ খাওয়া বাঙালিকে যিনি ‘ভণ্ড’ বলছেন, তাঁর নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁকে ‘ভণ্ড সাধু’ বলেও আক্রমণ করা হয়েছে অভিযোগপত্রে। একই সঙ্গে পুলিশের কাছে দ্রুত অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস।
দুর্গাপুজোর আগে মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ক এ বার রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি আইনি অভিযোগের পর্যায়েও পৌঁছল। বাঙালির খাদ্যাভ্যাস ও দুর্গাপুজোর সংস্কৃতি নিয়ে এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও তীব্র হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর।




