আফগানিস্তানে চরম দারিদ্র্য: দু’মুঠো খাবারের জন্য কন্যাসন্তান বিক্রির সিদ্ধান্ত, চোখের জলে ভেঙে পড়ছেন বাবা-মায়েরা

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

আফগানিস্তানের দরিদ্রতম অঞ্চলগুলির একটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকটের ছবি সামনে এসেছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও ঋণের বোঝা সামলাতে না পেরে বহু পরিবার নিজেদের অল্পবয়সি কন্যাসন্তানদের ভবিষ্যৎ কার্যত বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কোটি কোটি মানুষ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না, আর সেই সংকটের সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিচ্ছে শিশুরাই।

দেশটির ঘোর প্রদেশ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক এক বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, ঋণের চাপ এবং খাদ্যসংকটের কারণে অনেক পরিবার এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা কোনও বাবা-মায়ের পক্ষেই কল্পনা করা কঠিন।

সাত বছরের যমজ কন্যা রোকিয়া ও রোহিলার বাবা আবদুল রশিদ আজিমি জানান, চরম আর্থিক দুর্দশার কারণে তিনি নিজের মেয়েদের বিক্রি করার কথা ভাবছেন। তাঁর কথায়, সংসারে খাবার জোগানোর সামর্থ্য নেই, কাজের সুযোগও নেই।

সংবাদমাধ্যমের সামনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, সারাদিন কাজের খোঁজে ঘুরেও খালি হাতে ফিরতে হয়। বাড়ি ফিরে সন্তানদের মুখে যখন রুটির দাবি শোনেন, তখন তাঁদের কিছুই দিতে পারেন না। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি স্বীকার করেন, এই সিদ্ধান্ত তাঁর হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে, কিন্তু পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য আর কোনও পথ খোলা নেই।

একই প্রদেশের আর এক বাসিন্দা সঈদ আহমদের কাহিনিও সমান মর্মান্তিক। পাঁচ বছরের মেয়ে শাইকার অ্যাপেন্ডিসাইটিস ও যকৃতে সিস্ট ধরা পড়ার পর চিকিৎসার খরচ জোগাতে তিনি ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত এক আত্মীয়ের সঙ্গে আর্থিক চুক্তির মাধ্যমে মেয়ের ভবিষ্যৎ বিয়ের বিনিময়ে অর্থ সংগ্রহ করেন।

সঈদ জানান, চিকিৎসার জন্য প্রায় দুই লক্ষ আফগানি টাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে পুরো অর্থ একসঙ্গে নেননি তিনি। কারণ তা হলে মেয়েকে সঙ্গে সঙ্গেই আত্মীয়ের পরিবারের হাতে তুলে দিতে হত। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচের টাকা নিয়েই অস্ত্রোপচার করান এবং বাকি অর্থ কয়েক বছর পরে নেওয়ার শর্তে মেয়েকে নিজের কাছেই রাখেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক বছর আগেও বহু আফগান পরিবার আন্তর্জাতিক সাহায্যের আওতায় খাদ্যশস্য, রান্নার তেল, ডাল ও শিশু পুষ্টি সামগ্রী পেত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় সেই নিরাপত্তা বলয় প্রায় ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক দাতা দেশ আর্থিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

জাতিসংঘের হিসাব বলছে, আফগানিস্তানের প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজনই বর্তমানে মৌলিক চাহিদা পূরণে অক্ষম। প্রায় ৪৭ লক্ষ মানুষ দুর্ভিক্ষের এক ধাপ দূরে অবস্থান করছেন। কর্মসংস্থানের সংকট, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং কমতে থাকা বিদেশি সহায়তা মিলিয়ে মানবিক বিপর্যয় গভীরতর হচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন মূলত মেয়েদেরই বিক্রি করা হচ্ছে? আফগান সমাজে ছেলেদের ভবিষ্যতের উপার্জনক্ষম সদস্য হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, মেয়েদের বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ থেকে আর্থিক বা উপহারমূলক সহায়তা পাওয়ার দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রথা রয়েছে। ফলে আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলির কাছে কন্যাসন্তানকে বিয়ের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে লিঙ্গবৈষম্য আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ের প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া এবং সামাজিক সংকটের এই দ্বৈত চাপে আফগানিস্তানের অসংখ্য পরিবার আজ বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর