২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের ঠিক আগের দিন শুরু হচ্ছে সংসদের বাদল অধিবেশন, আর সেই মঞ্চেই ‘আসল তৃণমূল’ নিয়ে নতুন সংঘাতের ইঙ্গিত দিলেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্রোহী সাংসদদের দাবি, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁরাই প্রকৃত তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে প্রশ্ন উঠছে, যদি এই দাবি আনুষ্ঠানিক রূপ পায়, তাহলে জোড়াফুল প্রতীকের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
সোমবার দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সংসদ অধিবেশন শুরু হলে তৃণমূল কংগ্রেস নামে একটি দল উপস্থিত থাকবে, কিন্তু তাঁদের পক্ষ থেকেও দাবি করা হবে যে প্রকৃত তৃণমূল তাঁরাই। সেই দাবির ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা যাচাইয়ের কথাও বলেন তিনি।
সুদীপের মতে, এই বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতেই হবে। পাশাপাশি তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন জোড়াফুল প্রতীক সাময়িকভাবে ‘ফ্রিজ’ বা স্থগিতও হতে পারে। যদিও আপাতত নির্বাচন কমিশনের কাছে দলীয় স্বীকৃতি বা প্রতীকের দাবি নিয়ে যাওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বর্তমানে বিদ্রোহী শিবির এনসিপিআই-র সঙ্গে রয়েছে। সুদীপের বক্তব্য, এই অবস্থান মূলত প্রক্রিয়াগত এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের জটিলতা এড়ানোর জন্যই নেওয়া হয়েছে।
তবে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি সামনে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নও। অন্য একটি রাজনৈতিক দলে মিশে যাওয়ার কথা স্পিকারকে জানিয়ে দেওয়ার পরও কি কোনও গোষ্ঠী নিজেদের পুরনো দলের দাবিদার হতে পারে?
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিয়েছেন, আদালতের সিদ্ধান্ত আগাম অনুমান করা সম্ভব নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা, সাংগঠনিক কাঠামো এবং অন্যান্য আইনি বিষয় খতিয়ে দেখেই আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়।
এ বিষয়ে কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি দেবাশিস করগুপ্ত জানান, সংবিধানের দশম তফসিল অনুযায়ী কোনও দলের দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি নির্বাচিত প্রতিনিধি অন্য দলে যোগ দিলে দলত্যাগ বিরোধী আইন কার্যকর নাও হতে পারে। তাঁরা সংসদে নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে বা নির্দল হিসেবেও থাকতে পারেন।
তবে দলীয় প্রতীক এবং তহবিলের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। করগুপ্তের ব্যাখ্যায়, এই ধরনের বিরোধ সংসদের নয়, নির্বাচন কমিশনের অধিক্ষেত্রে পড়ে। কমিশন তখন দলটির সাংসদ-বিধায়ক এবং সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে কারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, তা খতিয়ে দেখে।
১৯৬৮ সালের ‘ইলেকশন সিম্বলস (রিজার্ভেশন অ্যান্ড অ্যালটমেন্ট) অর্ডার’-এর উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনও দলের সাংসদ-বিধায়ক এবং সাংগঠনিক অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যদি প্রতীক ও তহবিলের দাবি জানায়, কমিশন তা যাচাই করতে পারে। তদন্ত চলাকালীন দুই পক্ষকে পৃথক প্রতীকও দেওয়া হতে পারে।
ভারতের রাজনীতিতে এমন নজির নতুন নয়। মহারাষ্ট্রে শিবসেনা বিভাজনের পর দলীয় প্রতীক একনাথ শিন্দের হাতে যায়। একইভাবে এনসিপির ‘ঘড়ি’ প্রতীকও শেষ পর্যন্ত শরদ পওয়ারের পরিবর্তে অজিত পওয়ারের গোষ্ঠীর হাতে যায়।
তবে তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি এখনও সেই পর্যায়ে পৌঁছয়নি। নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক দাবি না যাওয়ায় বিষয়টি আপাতত রাজনৈতিক জল্পনার স্তরেই রয়েছে। এদিকে সুদীপের মন্তব্য নিয়ে কটাক্ষ করেছেন তৃণমূল সাংসদ ও আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, সুদীপের আইন ও সংবিধান সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে চান না, তবে বয়সের প্রতি সম্মান রেখেই বিষয়টি দেখছেন।
বাদল অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে তাই রাজনৈতিক মহলের নজর এখন একটাই প্রশ্নে—সংসদের অন্দরেই কি ‘আসল তৃণমূল’ নিয়ে নতুন লড়াই শুরু হবে, নাকি বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালত ও নির্বাচন কমিশনের দ্বারেই পৌঁছবে?



