নজরবন্দি ব্যুরো: সুপ্রিম কোর্টে বড় আইনি স্বস্তি পেলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। কলকাতা হাই কোর্টের বিদেশযাত্রা সংক্রান্ত নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে করা আবেদনে সোমবার শীর্ষ আদালত তাঁকে তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করানোর অনুমতি দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, একজন ব্যক্তির বিদেশে যাওয়ার এবং নিজের পছন্দমতো চিকিৎসা বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনা (V Mohana)-র বেঞ্চ এই নির্দেশ দিয়েছে। আদালত জানিয়েছে, অভিষেক সেপ্টেম্বরে তিন সপ্তাহ বিদেশে থাকতে পারবেন। তবে তাঁকে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট ব্যবহার করেই যাতায়াত করতে হবে।
শীর্ষ আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, বিদেশযাত্রার আগে অভিষেককে তাঁর সফরের itinerary, বিদেশে থাকার ঠিকানা, যে চিকিৎসক বা হাসপাতালে চিকিৎসা করাবেন তার বিবরণ, কত দিন থাকবেন এবং ফ্লাইট সংক্রান্ত তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে জানাতে হবে। এই তথ্য তদন্তকারী সংস্থাগুলি নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে, তবে তা গোপনীয় রাখতে হবে।
বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। বেঞ্চের বক্তব্য, শুধুমাত্র কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা চলছে বলেই তাঁকে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা যায় না। প্রত্যেক ব্যক্তির বিদেশে যাওয়ার এবং নিজের চিকিৎসা পদ্ধতি ও চিকিৎসক বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
এর আগে কলকাতা হাই কোর্টে বড় ধাক্কা খেয়েছিলেন অভিষেক। ৫ অগস্ট বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের (Saugata Bhattacharyya) একক বেঞ্চ তাঁর বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসার আবেদন খারিজ করে দেয়। তার আগে আদালত তাঁকে এসএসকেএম হাসপাতালের (SSKM Hospital) চক্ষু বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে পরীক্ষা করানোর নির্দেশ দিয়েছিল।
হাই কোর্টের নির্দেশ ছিল, মেডিক্যাল বোর্ড পরীক্ষা করে জানাবে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করানো আদৌ প্রয়োজন কি না এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ভারতে সম্ভব কি না। কিন্তু অভিষেকের আইনজীবী আদালতে জানান, তাঁর মক্কেল এসএসকেএম-এর ওই মেডিক্যাল বোর্ডের কাছে যেতে রাজি নন। এরপরই হাই কোর্ট বিদেশযাত্রার অনুমতি না দিয়ে আবেদনটি খারিজ করে।
এর আগে ৩ অগস্টও এই একই বিষয় নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হয়েছিল। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ তখন বিষয়টি কলকাতা হাই কোর্টে ফেরত পাঠিয়ে সাত দিনের মধ্যে আবেদনটি নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছিল। সেই নির্দেশের পর ৫ অগস্ট হাই কোর্টে শুনানি হয় এবং আবেদন খারিজ হয়ে যায়।
হাই কোর্টে অভিষেকের বিদেশযাত্রার বিরোধিতা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার (Rajdeep Majumdar) আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন, অভিষেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও তদন্ত চলছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে বলেও রাজ্যের তরফে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।
রাজ্যের আরও বক্তব্য ছিল, অভিষেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলায় তদন্তের প্রয়োজনে তাঁর দেশে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে অভিষেকের আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর নিজের চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একই চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও আদালতে তুলে ধরা হয়।
হাই কোর্টে অভিষেকের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছিল, তিনি আগে একাধিকবার বিদেশে চিকিৎসার জন্য গিয়েছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরেছেন। তাঁর কাছে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট থাকায় বিদেশযাত্রা ও অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যও কর্তৃপক্ষের নজরদারির আওতায় থাকবে বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত হাই কোর্টের সিদ্ধান্তের পর ফের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। সোমবার সেই আবেদনের শুনানিতেই শীর্ষ আদালত বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দিল। ফলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা আইনি টানাপড়েনের আপাতত অবসান হল।
তবে এই অনুমতি শর্তহীন নয়। ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টে ভ্রমণ, চিকিৎসা ও থাকার যাবতীয় তথ্য তদন্তকারী সংস্থাকে জানানো এবং সেই তথ্য গোপন রাখার নির্দেশ রয়েছে। ফলে অভিষেকের চিকিৎসার জন্য বিদেশযাত্রার পথ খুললেও চলমান আইনি প্রক্রিয়া থেকে তিনি মুক্ত হচ্ছেন না।
সুপ্রিম কোর্টের আজকের রায়ে তাই একদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদেশে চিকিৎসার রাস্তা খুলল, অন্যদিকে তাঁর চলমান মামলাগুলির তদন্তও নিজের গতিতে চলবে। আপাতত সবচেয়ে বড় খবর—কলকাতা হাই কোর্টের বাধা পেরিয়ে সেপ্টেম্বরে তিন সপ্তাহ বিদেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করাতে পারবেন অভিষেক।



