দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ পাস সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এনেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ED। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি, প্রাক্তন রাজ্য মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের মালিকানাধীন Octave Records-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়েছিল। ED-র বক্তব্য অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল সেন এই অর্থকে ‘রয়্যালটি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ এই প্রসঙ্গ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এতদিন যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সততার দাবি করেছে, তদন্তে এবার সেই দাবিও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ED-র প্রকাশিত বিবৃতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়নি। সংস্থাটি অর্থের লেনদেনের কথা জানিয়েছে এবং ইন্দ্রনীল সেনের বক্তব্য হিসেবে ‘রয়্যালটি’-র ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছে। ED ওই ৩০ লক্ষ টাকার লেনদেনকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের প্রমাণ হিসেবে বিবৃত করেনি।
ED-র তদন্তের দাবি অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল সেন এবং তাঁর মালিকানাধীন Octave Records-এর অ্যাকাউন্টে তাঁর মন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে ৩.৮ কোটি টাকার বেশি নগদ জমা পড়েছিল। এরই মধ্যে Octave Records-এর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা ব্যাঙ্কিং চ্যানেলের মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।
ইন্দ্রনীল সেনের বক্তব্য হিসেবে ED জানিয়েছে, ওই অর্থ ‘রয়্যালটি’ বাবদ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই রয়্যালটি কোন কাজের জন্য এবং তার সম্পূর্ণ আর্থিক নথি কী, সে বিষয়ে ED-র প্রকাশিত বিবৃতিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এর পাশাপাশি, ইন্দ্রনীল সেন রাজ্য সরকারের মন্ত্রী থাকাকালীন পর্যটন ও সংস্কৃতি দফতরের ৮৫ কোটি টাকার বেশি মূল্যের একাধিক টেন্ডার তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সংস্থাকে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেছে ED। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, ওই সংস্থাগুলি পরে ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় অর্থ স্থানান্তর করেছিল এবং টেন্ডার পাওয়া সংস্থাগুলির অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল নগদ তোলার তথ্যও পাওয়া গিয়েছে।
পুরো তদন্তের সূত্র দুর্গাপুজোর ‘Preview Shows’ ঘিরে ওঠা অভিযোগ। ED-র দাবি, MassArt নামের একটি সংগঠনের মাধ্যমে কলকাতার একাধিক পুজোমণ্ডপে সাধারণ মানুষের জন্য ‘প্রিভিউ’ পাস বিক্রি করা হয়েছিল। টিকিটের দাম ছিল প্রায় ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত।
তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, ২০২৩ এবং ২০২৪ সাল মিলিয়ে এক লক্ষেরও বেশি টিকিট বিক্রি হয়েছিল। সংগঠনটির বিরুদ্ধে UNESCO-র নাম, লোগো এবং পরিচিতি অনুমতি ছাড়া বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করার অভিযোগও করেছে ED। সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ নগদ তুলে নেওয়া অথবা বিভিন্ন খাতে খরচ দেখানোর মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বলেও দাবি তদন্তকারী সংস্থার।
এই মামলায় ED ইতিমধ্যেই ইন্দ্রনীল সেন, তাঁর স্ত্রী মধুচ্ছন্দা সেন এবং তাঁদের সহযোগীদের সঙ্গে যুক্ত একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে। ইন্দ্রনীল সেনকে কলকাতার ED দফতরে প্রায় ১০ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে।
ED-র দাবির পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে এই অর্থের বিষয়ে রয়্যালটির ব্যাখ্যাই সামনে এসেছে। তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের বক্তব্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি, গান লেখা ও সুর করার সঙ্গে যুক্ত। ইন্দ্রনীল সেনের সংস্থার সঙ্গে সেই কাজের সূত্রে চুক্তি থাকায় রয়্যালটি হিসেবে অর্থ পাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক। তিনি দাবি করেছেন, এই অর্থ নগদে নয়, ব্যাঙ্কিং চ্যানেলের মাধ্যমে এবং প্রয়োজনীয় কর কেটে দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে বিজেপির তরফে এই লেনদেনকে রাজনৈতিক ভাবে প্রশ্নের মুখে তোলা হয়েছে। দিলীপ ঘোষও সেই প্রসঙ্গেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, এতদিন বিভিন্ন নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও মমতা নিজে রাজনৈতিক ভাবে সুরক্ষিত থেকেছেন। এবার তদন্তে তাঁর অ্যাকাউন্টে অর্থ যাওয়ার তথ্য সামনে আসায় সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে দিলীপ ঘোষের এই মন্তব্য রাজনৈতিক বক্তব্য। এটিকে ED-র তদন্তের কোনও সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রকাশ্যে থাকা তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে ওই অর্থের লেনদেনের কথা উল্লেখ করেছে ED, কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই মামলায় অভিযুক্ত করেছে—এমন কথা সংস্থার প্রকাশিত বিবৃতিতে নেই।
তদন্ত এখনও চলছে। ফলে ইন্দ্রনীল সেনের সংস্থা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে যাওয়া প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার প্রকৃতি, তার নথিপত্র এবং এই লেনদেনের সঙ্গে পুজোর পাস সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের কোনও প্রত্যক্ষ যোগ রয়েছে কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরবর্তী পর্যায়েই স্পষ্ট হবে।



