এসআইআরের কাজ শেষ হতে না হতেই বিধানসভা নির্বাচন। ভোটের দায়িত্ব সামলানোর পর আবার জনগণনার কাজে যুক্ত হতে হয়েছে বহু শিক্ষককে। এর মধ্যেই ফের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজ করার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগে স্কুলশিক্ষকদের একাংশ। তাঁদের আশঙ্কা, একের পর এক শিক্ষা-বহির্ভূত দায়িত্বের জেরে স্কুলে নিয়মিত পঠনপাঠন আরও ব্যাহত হতে পারে।
যে কাজের কথা সামনে এসেছে, তা মূলত এসআইআরের আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তালিকা মিলিয়ে দেখার পরবর্তী প্রক্রিয়া। বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা তৈরি হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বর্তমান পরিস্থিতি যাচাই করতে বিএলওদের বাড়ি বাড়ি যেতে হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপও নিতে হবে তাঁদের। আর সেই কাজে ফের স্কুলশিক্ষকদের বিএলও হিসেবে যুক্ত করার সম্ভাবনাই শিক্ষক মহলে চিন্তা বাড়িয়েছে।
তবে এই মুহূর্তে বিষয়টি নিশ্চিত ভাবে নতুন দায়িত্ব বণ্টনের ঘোষণা নয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য পরবর্তী কাজ হিসেবেই বাড়ি বাড়ি যাচাইয়ের প্রসঙ্গটি সামনে এসেছে। সেই সম্ভাবনাতেই আপত্তি শিক্ষকদের একাংশের।
শিক্ষকদের বক্তব্য, গত বছরের নভেম্বর থেকে এসআইআরের কাজের সঙ্গে তাঁদের যুক্ত করা হয়েছিল। সেই কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সালের শুরুতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা এবং তার পরে বিধানসভা নির্বাচন ঘিরেও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এখন আবার জনগণনার কাজে অনেকে যুক্ত রয়েছেন। ফলে একের পর এক প্রশাসনিক ও নির্বাচনী দায়িত্বের কারণে স্কুলের স্বাভাবিক কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
সমস্যার জায়গাটি আরও স্পষ্ট হচ্ছে স্কুলের শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি সামনে রাখলে। পুজোর ছুটি শেষ হওয়ার পর বিভিন্ন শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও পরীক্ষা চলার কথা। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিও থাকে। এই সময়েই যদি শিক্ষকরা ফের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তা হলে ক্লাস এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি—দুই ক্ষেত্রেই চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা শিক্ষক মহলের।
শিক্ষা-বহির্ভূত কাজে শিক্ষকদের যুক্ত করা নিয়ে ক্ষোভ অবশ্য নতুন নয়। এসআইআরের সময়ও একই প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরেই বিএলও-র কাজে যুক্ত শিক্ষকদের একাংশ জানিয়েছিলেন, স্কুলের কাজের পরে বা ছুটির দিনে এসআইআরের দায়িত্ব সামলানো বাস্তবে কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে স্কুলের পরীক্ষা এবং অন্যান্য একাডেমিক কাজ সময়মতো শেষ করা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
জনগণনার কাজ নিয়েও একই ধরনের সমস্যা সামনে এসেছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার স্কুল-কলেজের প্রায় ১৯০০ শিক্ষককে জনগণনার কাজে যুক্ত করার দাবি উঠে এসেছিল। কয়েকটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক শিক্ষকসংখ্যা কম থাকার কথা জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, একসঙ্গে এত শিক্ষক প্রশাসনিক কাজে চলে গেলে স্কুল চালানোই কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে ফের বিএলওর দায়িত্বের সম্ভাবনা শিক্ষক মহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তুলছে—শিক্ষকদের দিয়ে একের পর এক প্রশাসনিক কাজ করানো হলে তাঁরা পড়াবেন কখন?
ভোটকর্মী ও বিএলও মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের বক্তব্যও সেই উদ্বেগের দিকেই ইঙ্গিত করছে। তাঁর মতে, শিক্ষকদের বার বার স্কুলের মূল কাজের বাইরে বিভিন্ন দায়িত্বে যুক্ত করা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পঠনপাঠনে। একের পর এক দায়িত্বের কারণে শিক্ষকদের নিয়মিত ভাবে স্কুলে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এর আগে জনগণনার দায়িত্ব নিয়েও শিক্ষক মহলের একাংশ ‘অন ডিউটি’ স্বীকৃতির দাবি তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, স্কুলের ক্লাস শেষ হওয়ার পরে বা ছুটির দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই কাজ করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে সামনে এখন দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা তৈরির পর বিএলওদের ঠিক কী দায়িত্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, সেই কাজে স্কুলশিক্ষকদের কতটা যুক্ত করা হবে। সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হলে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা এবং মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের প্রস্তুতির সময় তার প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন শিক্ষক মহলের বড় উদ্বেগ।
একদিকে ভোটার তালিকা, অন্য দিকে জনগণনা—পরপর প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে ফের বিএলওর কাজের সম্ভাবনা। আর তার মাঝেই শিক্ষক মহলের প্রশ্ন একটাই—পঠনপাঠনের জন্য সময়টা থাকবে কখন?



