মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে রবিবারও উত্তপ্ত দিল্লি। শুক্রবার ও শনিবারের পর তৃতীয় দিনেও রাজধানীর রাজপথে দেখা গেল বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের বিক্ষোভ। যন্তর মন্তরের দিকে এগোনোর পথে একাধিক জায়গায় ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের আটক করেছে পুলিশ। এরই মধ্যে শনিবারের বিক্ষোভ কভার করতে গিয়ে তিন মহিলা সাংবাদিককে যৌন হেনস্থার অভিযোগ ওঠা এক পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরের দাবিও জোরালো হয়েছে।
রবিবার যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে মূলত দু’টি মিছিলের কর্মসূচি ছিল। একটি নাগরিক সমাজের তরফে, অন্যটি যুব কংগ্রেসের। কর্মসূচির আগে মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। টলস্টয় মার্গ, জনপথ রোড, সংসদ মার্গ এবং কেরল ভবনের দিকেও ব্যারিকেড বসানো হয়। প্রায় ৫,০০০ পুলিশকর্মী, র্যাফ এবং আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মিছিল শুরু হওয়ার আগেই পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার সামনে আলাদা করে বিক্ষোভ শুরু হয়। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র কর্মীদের সঙ্গে পরে বামপন্থী দলের প্রতিনিধিরাও সেখানে যোগ দেন। বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও অবস্থানে বসেন। তাঁদের মূল দাবি, শনিবার যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের খবর করতে গিয়ে তিন মহিলা সাংবাদিকের সঙ্গে যে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে, সেই ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে হবে।
অভিযোগের কেন্দ্রে দিল্লি পুলিশের এসিপি বিবেক ভগত। তিন মহিলা সাংবাদিকের অভিযোগ, শনিবার যন্তর মন্তরে খবর সংগ্রহের সময় তাঁরা পুলিশ আধিকারিকদের হাতে যৌন হেনস্থার শিকার হন। অভিযোগের ভিত্তিতে এফআইআর দায়েরের দাবি জানানো হলেও পুলিশ অভিযুক্ত এসিপির বিরুদ্ধে মামলা নেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সিজেপির দাবি, অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিককে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলি এখনও তদন্তাধীন; কোনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা ওই পুলিশকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করেনি।
এই ইস্যুতেই বিরোধীদের আক্রমণের মুখে পড়েছে দিল্লি পুলিশ। স্বাধীন সাংবাদিক রোজ়িও অভিযুক্ত পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে এফআইআর-এর দাবিতে শনিবার রাত থেকে বিক্ষোভ করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রবিবার তাঁকে আটক করে পুলিশ। ঘটনাটি নিয়ে আরও ক্ষোভ ছড়ায় বিক্ষোভকারীদের মধ্যে।
অন্য দিকে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ইন্ডিয়া গেটের দিকে মিছিলের চেষ্টা করেন আম আদমি পার্টির কর্মীরা। দলের নেতা সৌরভ ভরদ্বাজকে আটক করা হয়। বিক্ষোভে যোগ দেয় ছাত্র সংগঠন আইসা এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন এনএসইউআই-ও। অশোক রোডের কাছে আইসার মিছিল থেকে সংগঠনের জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাকেও আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পরে আটক বিক্ষোভকারীদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
নেহার সঙ্গে স্বাধীন সাংবাদিক রোজ়িকে আটক করার ঘটনাও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দীপ দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেন, মহিলা সাংবাদিকের অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টে অভিযোগকারীকেই আটক করা হয়েছে। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বাড্রাও এই ঘটনাকে সামনে রেখে দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের ক্ষোভ অবশ্য শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ নেই। রবিবার মহারাষ্ট্রেও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হয়েছে। উদ্ধব ঠাকরে ও রাজ ঠাকরের নেতৃত্বে মুম্বইয়ে মিছিল থেকে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ওঠে। একই সঙ্গে মহারাষ্ট্রে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR বাতিলের দাবিও জানানো হয়।
জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ SIR-কে ঘিরে। তাঁদের দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে আনন্দবাজার জানিয়েছে, SIR-সহ একাধিক বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ মাসে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তির কথাও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পুরনো একটি মামলার তদন্ত ফের শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে কেরল সরকার। রাজ্যের পূর্ত দফতরের সচিব থাকার সময় অনিয়মের অভিযোগ এবং তাঁর আমলে কেরল স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত এক মালয়েশীয় আধিকারিকের আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বিষয়টিও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে এমন কোনও তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ফলে একই দিনে জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে একাধিক দিক থেকে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। এক দিকে SIR ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলন, অন্য দিকে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে মহিলা সাংবাদিকদের যৌন হেনস্থার অভিযোগ। রাজধানীর রাজপথে দুই ইস্যু একসঙ্গে মিশে গিয়ে রবিবারের বিক্ষোভকে আরও রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।
এই আন্দোলন এখানেই থামছে না। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ফের বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। ফলে আগামী কয়েক দিনেও নির্বাচন কমিশন এবং দিল্লি পুলিশ—দুই ইস্যুতেই বিরোধীদের চাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।



