মিলন প্রধানের রক্ষাকবচ খারিজ, ‘জামিনের আবেদন করুন’, ঘটনাপ্রবাহে বিস্মিত প্রধান বিচারপতি!

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের নতুন মামলায় সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া রক্ষাকবচ বাতিল করল ডিভিশন বেঞ্চ। জামিনের আবেদন করার পরামর্শ আদালতের।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া নতুন মামলায় দেওয়া রক্ষাকবচ খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। শুক্রবার প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র বি ঘুগে এবং বিচারপতি ওম নারায়ণ রাইয়ের বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের আগের নির্দেশ বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে মিলন প্রধানের পক্ষকে জামিনের আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছে আদালত। শুনানিতে কেন আগাম জামিনের আবেদন করা হয়নি, অথবা গ্রেফতারের পর কেন জামিন চাওয়া হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি।

এর আগে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের সিঙ্গল বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, নতুন মামলায় মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করা যাবে না। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপও করতে পারবে না পুলিশ। রাজ্য সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়। শুক্রবার সেই মামলার শুনানিতেই সিঙ্গল বেঞ্চের রক্ষাকবচ সংক্রান্ত নির্দেশ খারিজ করে দেওয়া হয়।

শুনানির শুরুতেই সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধান বিচারপতি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই পরিস্থিতিতে রক্ষাকবচের পরিবর্তে জামিনের আবেদন করাই উপযুক্ত আইনি পথ। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “একক বেঞ্চ কী ভাবে এই নির্দেশ দিতে পারে? এই নির্দেশ দেখে আমি বিস্মিত!”

মিলন প্রধানের আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য আদালতে জানান, তাঁর মক্কেল নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন এবং ১৫ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বর অন্য একটি বিরোধী দল মিলনকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপরই পুরনো মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে আদালতে সওয়াল করেন তিনি।

আইনজীবীর বক্তব্য, ভোটের আর কয়েক দিন বাকি থাকায় নতুন মামলায় জামিনের আবেদন করে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ করার মতো সময় কম ছিল। মিলন যাতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, সেই কারণেই রক্ষাকবচ চাওয়া হয়েছিল বলে আদালতে জানান তিনি।

এই যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, কেন আগাম জামিনের আবেদন করা হয়নি। এমনকি গ্রেফতারির পরেও জামিনের আবেদন করা হয়নি কেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। আদালতের বক্তব্য, নির্বাচনের জন্য সময় থাকলে জামিনের আইনি প্রক্রিয়াও চালানো সম্ভব।

প্রধান বিচারপতি বলেন, “আপনার সওয়াল শুনে বলতে হচ্ছে, এটা জামিনের জন্যই উপযুক্ত মামলা। আপনার জামিনের আবেদন করা উচিত। নির্বাচনের জন্য সময় আছে। ছুটির দিনেও আদালত বসতে পারে।”

শনিবার বা রবিবার আদালত বসে আইনি প্রক্রিয়া চালানো সম্ভব বলেও জানান প্রধান বিচারপতি। নিজের বিচারকজীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বম্বে হাই কোর্টে বিচারপতি থাকাকালীন ১৫ অগস্টও একটি মামলা শুনেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ছুটির দিন হলেও প্রয়োজন হলে আদালতের আইনি প্রক্রিয়া থেমে থাকে না।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টিকেও আদালত আলাদা আইনি সুবিধার কারণ হিসেবে দেখেনি। প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে দেন, মিলন প্রধান নির্বাচনে লড়তে পারেন, কিন্তু প্রার্থী হওয়ার কারণে আইনের প্রয়োগ থেকে কোনও বিশেষ ছাড় পাওয়া যায় না।

প্রধান বিচারপতির মন্তব্য, “নির্বাচনে লড়াই করছেন বলে তিনি বিশেষ ব্যক্তি নন। আইনের চোখে সকলে সমান।” তিনি আরও বলেন, “আপনি ভগবান নন। প্রত্যেক সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি বিশ্বাস রয়েছে। আপনি বিশেষ কেউ নন। জামিনের আবেদন করুন।”

আদালতের বক্তব্য, প্রত্যেক নাগরিকের জন্য আইন সমান এবং নির্বাচনের সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার কোনও বিরোধ নেই। অর্থাৎ, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি থাকলেও সংশ্লিষ্ট ফৌজদারি মামলায় প্রচলিত আইনি পথেই যেতে হবে।

এদিকে, রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে জানান, যে মামলায় মিলন প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেখানে আগে থেকেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। সেই পরোয়ানার ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হয়েছে বলে রাজ্যের বক্তব্য।

রাজ্যের তরফে আরও জানানো হয়, যে অতিরিক্ত মামলাটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাতে মিলনকে ১৯ সেপ্টেম্বরই গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২২ সেপ্টেম্বর আদালতের নির্দেশের পরে ওই মামলায় নতুন করে গ্রেফতার করা হয়নি বলেও জানায় রাজ্য।

রাজ্যের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সরকার সংশ্লিষ্ট পুরনো মামলাগুলি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই কারণেই দীর্ঘ সময় মামলাগুলিতে কার্যকরী পদক্ষেপ করা হয়নি। পাশাপাশি, সংশ্লিষ্ট মামলাগুলিতে ২০২১ সাল থেকেই গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল বলেও আদালতে জানানো হয়েছে। কমিশনের নির্দেশেই সেই পরোয়ানা কার্যকর করে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে রাজ্যের দাবি।

ফলে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে মিলন প্রধানকে ঘিরে আইনি লড়াই নতুন মোড় নিল। সিঙ্গল বেঞ্চের দেওয়া রক্ষাকবচ আর বহাল থাকল না। ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী আইনি প্রতিকারের ক্ষেত্রে জামিনের আবেদনই উপযুক্ত পথ। এখন সেই আবেদনের পর আদালত কী নির্দেশ দেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন