‘শারদোৎসব’ লিখলে কমিউনিস্টদের স্টল নয়, ‘দুর্গাপূজা’ লিখতেই হবে! বিধানসভায় কড়া বার্তা শুভেন্দুর

দুর্গাপুজোর নাম ‘শারদোৎসব’ লেখা নিয়ে বিধানসভায় সরব শুভেন্দু অধিকারী। ‘দুর্গাপূজা’ না লিখলে কমিউনিস্টদের বইয়ের স্টল না দেওয়ার বার্তার পাশাপাশি সিপিএমের অতীত শাসন নিয়েও আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

কলকাতা: দুর্গাপুজোর নাম ‘শারদোৎসব’ লেখা নিয়ে এবার সরাসরি আপত্তি জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বিধানসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাঁর দাবি, দুর্গাপুজোর মণ্ডপে কমিউনিস্টদের বইয়ের স্টল বসাতে হলে সেখানে স্পষ্ট করে ‘দুর্গাপূজা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। ‘শারদোৎসব’ লেখা হলে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিগুলিকে বামপন্থীদের বইয়ের স্টল না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সনাতন ধর্ম নিয়ে নিজের সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই প্রসঙ্গ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে মুসলিম, বৌদ্ধ, আদিবাসী-সহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের ধর্মীয় আচার স্বাধীনভাবে পালন করছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁর অভিযোগ, বামপন্থী মনোভাবের কিছু মানুষ পরিকল্পিতভাবে হিন্দু ও সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাসকে নিশানা করছেন।

তিলক পরা, শিখা রাখা, তুলসীর মালা পরা কিংবা গেরুয়া পোশাক পরা নিয়ে আপত্তি তোলার বিরুদ্ধেও সরব হন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, সনাতন ধর্মকে কেবল সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে বামপন্থীদের একাংশের মধ্যে।

এই প্রসঙ্গেই দুর্গাপুজোর নামকরণ নিয়ে তাঁর বক্তব্য সামনে আসে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘দুর্গাপূজা’ শব্দটি এড়িয়ে ‘শারদোৎসব’ বা ‘শারদ সংখ্যা’র মতো শব্দ ব্যবহারের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মানসিকতা কাজ করে। তাই দুর্গাপুজো কমিটিগুলিকে তিনি জানান, পুজো প্রাঙ্গণে কমিউনিস্ট সংগঠন বা সংশ্লিষ্টদের বইয়ের স্টল দেওয়ার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

শুভেন্দুর বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ যদি ‘শারদোৎসব’ লিখে বইয়ের স্টল করতে চান, তা হলে তাঁকে স্টল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, দুর্গাপুজোর সঙ্গে যুক্ত কর্মসূচিতে ‘দুর্গাপূজা’ নামটি স্পষ্টভাবে ব্যবহারের উপরেই জোর দিয়েছেন তিনি।

তবে এই বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন উঠছে, একটি পুজো কমিটির সাংস্কৃতিক বা বাণিজ্যিক পরিসরে কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের বইয়ের স্টল থাকবে কি না, এবং থাকলে কী নামে পুজোর উল্লেখ করা হবে—এই সিদ্ধান্তে সরকারের সরাসরি নির্দেশের আইনি ও প্রশাসনিক পরিধি কতটা। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে এটি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেই উঠে এসেছে।

বামপন্থীদের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও তীব্র করে শুভেন্দু নকশাল আন্দোলন এবং রাজ্যের অতীত রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রসঙ্গ টানেন। তাঁর অভিযোগ, বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে এমন কিছু ‘দেশবিরোধী চিন্তাভাবনা’র বীজ তৈরি হয়েছে, যা তিনি উপড়ে ফেলতে চান। এই লড়াই দীর্ঘায়িত হলেও পিছিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এরপরই সিপিএমের দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনকাল নিয়ে আক্রমণাত্মক হন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, বাম আমলে সাধারণ মানুষের অর্থ ব্যবহার করে রাজ্যজুড়ে প্রায় আড়াই হাজার দলীয় কার্যালয় তৈরি করা হয়েছিল।

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়েও সিপিএমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন তিনি। তাঁর দাবি, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে শাসক দলের ঘনিষ্ঠদের চাকরি পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি একেকজন নেতার পরিবারের বহু সদস্য সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ করেন শুভেন্দু।

এই অভিযোগগুলির কোনওটিকেই এদিন নতুন করে আদালতে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে পেশ করা হয়নি। এগুলি মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিযোগ। অতীতের নিয়োগ বা সরকারি অর্থ ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ কিংবা পৃথক তদন্তের ফল এই বক্তব্যে তুলে ধরা হয়নি।

শুভেন্দু আরও জানান, রাজ্যের সাম্প্রতিক ১৫ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি সিপিএমের ৩৪ বছরের শাসনকালও হিসাবের আওতায় আনার কথা ভাবছে তাঁর সরকার। তাঁর বক্তব্য, অতীতের অনিয়মের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সামনে আনা হবে।

দুর্গাপুজোর নাম ‘শারদোৎসব’ করার প্রবণতা নিয়েও নিজের আপত্তি স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে ধর্মীয় পরিচয়, বাম রাজনীতি এবং বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস—তিনটি বিষয়ই একই সূত্রে উঠে আসে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বিল নিয়ে উত্তপ্ত বিধানসভা অধিবেশনে এদিন দুর্গাপুজোর নামকরণ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন উপাদান যোগ হল।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন