নজরবন্দি ব্যুরো: কলকাতা পুরসভা নির্বাচন যত এগোচ্ছে, ততই জটিল হচ্ছে বঙ্গ রাজনীতির অঙ্ক। বিধানসভা নির্বাচনে যে লড়াই মূলত বিজেপি বনাম তৃণমূলকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল, পুরভোটের আগে সেই ছবিটাই কার্যত বদলে গিয়েছে। তৃণমূলের ভাঙন, NCPI (অতিভাল তৃণমূল)-এর আত্মপ্রকাশ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ভাল তৃণমূল’-এর পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান এবং বাম-কংগ্রেসের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে কলকাতার ভোট এবার অন্য রকম লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৪৫.৮৫ শতাংশ ভোট পেয়ে ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে ৮০টি আসন। কিন্তু সেই ফলকে হুবহু কলকাতা পুরসভায় বসানো কঠিন। কারণ পুরভোটের লড়াইয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন, স্থানীয় প্রার্থী, পুর পরিষেবা এবং দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তার উপর এবার কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক মানচিত্রও বদলাচ্ছে। পুরসভায় ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। হাওড়াতেও ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ছে। ফলে বহু পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ নতুন সীমানার মধ্যে পড়বে। কোন নেতার পুরনো ঘাঁটি কোন ওয়ার্ডে থাকবে, কে কোথা থেকে প্রার্থী হবেন—তা নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন হিসাব।
বিজেপি অবশ্য কলকাতা পুরসভা দখলের লক্ষ্যেই মাঠে নামছে। দলের তরফে নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারকে। কলকাতা পুরভোটে বিজেপির সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে তোলার পাশাপাশি জয়কে লক্ষ্য করেই প্রস্তুতি শুরু করেছে গেরুয়া শিবির।
কিন্তু এখানেই আসছে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন—বিজেপি কি একা লড়বে, নাকি NCPI (অতিভাল তৃণমূল)-কে সঙ্গে নেবে?
NCPI (অতিভাল তৃণমূল)-এর নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই দাবি করেছেন, কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে তাঁদের দল NDA-র অংশ হিসেবে বিজেপির সঙ্গে লড়াই করবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই পুরভোটে নামার প্রস্তুতি চলছে।
তবে বিজেপির বক্তব্য এখনও ভিন্ন। সুকান্ত মজুমদার প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, NCPI (অতিভাল তৃণমূল)-এর সঙ্গে জোট নিয়ে তাঁর কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। অর্থাৎ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি এবং বিজেপির প্রকাশ্য অবস্থানের মধ্যে এখনও ফারাক রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আসন সমঝোতা হয় কি না, সেটাই এখন দেখার।
রাজনৈতিকভাবে এই সম্ভাব্য সমীকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ NCPI (অতিভাল তৃণমূল)-এর নেতৃত্বে রয়েছেন এমন একাধিক নেতা, যাঁরা কিছুদিন আগেও তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন। ফলে বিজেপির সঙ্গে তাঁদের হাত মেলানো হলে কলকাতার পুরভোটে তৃণমূলের বিরুদ্ধে একটি নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে বিধানসভায় তৈরি হয়েছে আরেকটি পৃথক রাজনৈতিক মেরুকরণ। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ভাল তৃণমূল’ গোষ্ঠী বিধানসভার ভিতরে বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে। ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের পাশাপাশি এই গোষ্ঠীকেও পুরভোটের অঙ্কে কতটা গুরুত্বপূর্ণ করে দেখা হবে, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার—‘ভাল তৃণমূল’ এবং ‘অতিভাল তৃণমূল’ মূলত বঙ্গ রাজনীতিতে চলতি রাজনৈতিক অভিধা; এগুলি সংশ্লিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক নাম নয়। কিন্তু রাজনীতির ভাষায় এই শব্দগুলি ইতিমধ্যেই এমন একটি পরিচিতি তৈরি করেছে, যা সাধারণ পাঠকের কাছে ভাঙনের চরিত্রটা দ্রুত স্পষ্ট করে।
কলকাতা পুরভোটে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসও মাঠে থাকবে। বিধানসভায় তাদের ফলাফল বিজেপি বা তৃণমূলের তুলনায় অনেক পিছনে থাকলেও পুরভোটের চরিত্র আলাদা। কলকাতার বহু ওয়ার্ডে এখনও বামেদের পুরনো সংগঠন এবং কংগ্রেসের স্থানীয় প্রভাব রয়েছে। ফলে ত্রিমুখী বা চতুর্মুখী লড়াইয়ের মধ্যে এই ভোটব্যাঙ্কের সামান্য ওঠানামাও ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্ক। একদিকে বিজেপি, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল। তার পাশে NCPI (অতিভাল তৃণমূল), ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ভাল তৃণমূল’, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস। শেষ পর্যন্ত কে কার সঙ্গে থাকবে, কোন ওয়ার্ডে কার প্রার্থী দাঁড়াবে এবং কোথায় ভোট ভাগ হবে—তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করবে ফলাফল।
বিশেষ করে নতুন ওয়ার্ড বিন্যাস এই লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। পুরনো ওয়ার্ডের রাজনৈতিক শক্তি নতুন সীমানায় একই থাকবে না। কোনও জায়গায় পুরনো কাউন্সিলরের ব্যক্তিগত প্রভাব কাজে আসতে পারে, আবার কোথাও নতুন সীমানায় সম্পূর্ণ নতুন নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে।
বিজেপির সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু বিধানসভা নির্বাচনের সাফল্যকে পুরসভায় নিয়ে যাওয়া নয়। সেই ভোটকে ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠনে রূপান্তর করাই আসল পরীক্ষা। অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের সামনে আরও বড় পরীক্ষা—বহু বছরের কলকাতা পুরসভার সংগঠনকে ভাঙনের ধাক্কা সামলে কতটা অটুট রাখা যায়।
আর যদি বিজেপি ও NCPI (অতিভাল তৃণমূল) শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে লড়াই করে, তাহলে বিরোধী ভোটের সমীকরণও নতুন করে লিখতে হবে। আবার বিজেপি একা লড়লে NCPI আলাদা প্রার্থী দিলে বহু ওয়ার্ডে ভোট কাটাকাটির সম্ভাবনা তৈরি হবে। একইভাবে ‘ভাল তৃণমূল’ মাঠে নামলে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে তার প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিও নজরে থাকবে।
তাই কলকাতা পুরভোট এবার নিছক পুর পরিষেবা, রাস্তা, নিকাশি বা নাগরিক সমস্যার নির্বাচন হয়ে থাকছে না। বিধানসভা নির্বাচনের পর বাংলার শহুরে রাজনীতিতে কে আসল শক্তি—তারও পরীক্ষা হতে চলেছে এই ভোটে।
শেষ পর্যন্ত সমীকরণ যদি একই থাকে, তাহলে কলকাতার বহু ওয়ার্ডে লড়াই হবে সরাসরি বিজেপি বনাম তৃণমূলের বাইরেও। আর যদি ভোটের আগে জোট, আসন সমঝোতা ও প্রার্থী বদলের পালা শুরু হয়, তাহলে বর্তমান অঙ্ক আরও বদলাবে। একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার—কলকাতা পুরভোটের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই বঙ্গ রাজনীতিতে তার অঙ্ক হয়ে উঠেছে রীতিমতো পাঁচমুখী।



