নজরবন্দি ব্যুরো: ক্ষমতা হারানোর মাত্র চার মাসের মধ্যেই ফের বাংলার সরকারে ফেরার বার্তা দিলেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাদিবসের সভা থেকে তাঁর দাবি, বিজেপির অন্যায়ের জবাব দেবে বিজেপির মানুষই এবং খুব শীঘ্রই তৃণমূল কংগ্রেস আবার সরকারে ফিরবে।
একই দিনে কলকাতার রাজপথে কার্যত প্রকাশ্যে এল তৃণমূলের দুই শিবিরের রাজনৈতিক দূরত্ব। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন শিবিরের সভা হয় ক্যাথিড্রাল রোডে। অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ভাল তৃণমূল’ শিবিরের কর্মসূচি হয় রানি রাসমণি রোডে।
২১ জুলাইয়ের মতোই শুক্রবারও দুই শিবিরের পৃথক জমায়েত ঘিরে রাজনৈতিক নজর ছিল কলকাতায়। মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়দের সভাতেই তুলনামূলক বেশি ভিড় দেখা যায় বলে তৃণমূলের ওই শিবিরের দাবি। যদিও ঋতব্রত শিবিরের ছাত্রনেতা কোহিনুর মজুমদার এবং সুদীপ রাহার দাবি, আদালতের নির্ধারিত সীমা মেনেই তাঁদের সভা হয়েছে এবং কর্মসূচি সফল।
ছাত্র সমাবেশের মঞ্চ থেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হন মমতা। তাঁর অভিযোগ, সভা বানচাল করার উদ্দেশ্যেই ক্যাথিড্রাল রোডে গাড়ি ঢোকানো হয়েছিল। রাস্তার একটি লেন খোলা থাকায় সেখানে বাস ও ট্রাক ঢুকে পড়ে এবং অ্যাম্বুল্যান্সও আটকে যায় বলে অভিযোগ।
পরিস্থিতি সামলাতে মঞ্চ থেকেই প্রায় ২৫ মিনিট মাইক হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায় মমতাকে। পরে তারামণ্ডলের সামনে ওই লেনে পুলিশের তরফে গার্ডরেল বসানো হয়। ঘটনাকে কেন্দ্র করে সভাস্থলে সাময়িক উত্তেজনাও তৈরি হয়।
পুলিশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলে মমতার বার্তা, সভা-মিছিলের অনুমতি না দেওয়া হলে তিনি জেলায় জেলায় যাবেন। প্রশাসনের অনুমতির বদলে সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়েই কর্মসূচি করার হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে হেঁটেও কর্মসূচি করবেন।
এর আগে মঞ্চ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। ক্যামাক স্ট্রিটে তাঁর দফতরের বিলবোর্ড খুলতে পুরসভা ও পুলিশের অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর কড়া বার্তা, অত্যাচার এমন পর্যায়ে করা উচিত নয় যা পরে সহ্য করা সম্ভব হবে না।
শুক্রবারের সভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ভাল তৃণমূল’ এবং দিল্লিতে NCPI (অতিভাল তৃণমূল)-এ যোগ দেওয়া ২০ জন সাংসদকেও নিশানা করেন তৃণমূলের নেতারা। অভিষেক, কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক নেতা তাঁদের ‘বেইমান’ বলে আক্রমণ করেন।
শুধু রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, ওই নেতাদের আর তৃণমূলে ফেরানো উচিত নয়—এমন বার্তাও আসে মঞ্চ থেকে। মমতা বলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চলছে এবং মানুষের কাছেও তাঁদের জবাব দিতে হবে। একইসঙ্গে ‘আবার একটা পরিবর্তন’ আসছে বলেও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধেও ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আক্রমণ করেন মমতা ও অভিষেক। দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তাঁরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে নিশানা করেন। তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্যে স্পষ্ট, ছাত্র রাজনীতিকে সামনে রেখে জাতীয় রাজনীতিতেও বিজেপি-বিরোধী বার্তা জোরদার করতে চাইছে দল।
অন্যদিকে রানি রাসমণি রোডে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘ভাল তৃণমূল’ শিবিরের সভার সুর ছিল কিছুটা অন্যরকম। বিজেপির বিরুদ্ধে তুলনায় নরম অবস্থান রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মূল নিশানা করেন বক্তারা।
সেই সভায় প্রাক্তন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্যও ছিল মমতাকে ঘিরে। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্র রাজনীতির জায়গা দুর্বল হয়েছে এবং সেই সুযোগে ‘অ্যাডমিশন দালাল’রা ছাত্রনেতা হয়ে উঠেছে।
ফলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠাদিবসের কর্মসূচি এ বার শুধুই ছাত্র রাজনীতির অনুষ্ঠান থাকল না। একই শহরে, একই দিনে দুই পৃথক সভা দেখিয়ে দিল—তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এখন আর শুধুমাত্র সাংগঠনিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে মমতার সরকারে ফেরার আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা, অন্যদিকে ‘ভাল তৃণমূল’-এর পাল্টা রাজনৈতিক অবস্থান—আগামী দিনে এই দ্বন্দ্ব বাংলার রাজনীতিতে কতটা গভীর হয়, সেটিই এখন দেখার।



