নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে (Subhas Chandra Bose) নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে বড় পদক্ষেপ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজের (Anant Maharaj) বঙ্গবিভূষণ সম্মান প্রত্যাহার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের তরফে এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেশপ্রিয় পার্কের অমর একুশে উদ্যানে ভাষাদিবসের অনুষ্ঠানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) অনন্ত মহারাজকে এই সম্মান দিয়েছিলেন।
অনন্ত মহারাজ গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। সম্প্রতি নেতাজিকে নিয়ে তাঁর কয়েকটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। তাঁর বক্তব্যের জেরে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ শুরু হয় এবং থানায় অভিযোগও দায়ের করা হয় বলে জানা যায়।
নেতাজির স্বাধীনতা সংগ্রামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অনন্ত মহারাজ দাবি করেছিলেন, শুধু মহাত্মা গান্ধী (Mahatma Gandhi), জওহরলাল নেহরু (Jawaharlal Nehru) বা কংগ্রেসের আন্দোলনের ফলেই ভারত স্বাধীন হয়েছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। তাঁর বক্তব্যে কোচবিহারের মহারাজার ভূমিকার প্রসঙ্গও উঠে আসে।
এমনকি নেতাজির নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ (Indian National Army) গঠন নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। কোচবিহারের মহারাজা যুদ্ধ করে হিটলার ও আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাজিত করেছিলেন বলেও দাবি করেন অনন্ত মহারাজ। পাশাপাশি ব্রিটিশ বাহিনীর বন্দিদের নেতাজির হাতে তুলে দেওয়া এবং সেই সেনাদের নিয়েই আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের মতো বক্তব্যও দেন তিনি।
অনন্ত মহারাজ আরও দাবি করেন, কোচবিহারের মহারাজাকে স্বাধীন ভারতের সম্রাট করা হলে দেশভাগ হত না এবং ভারত-পাকিস্তান একসঙ্গে থাকত। তাঁর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বিশেষ করে নেতাজির ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিজেপির অন্দরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি।
বিতর্কের মধ্যেই বুধবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে নেতাজিকে অসম্মান করার বিষয়ে কড়া অবস্থান জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে কটূক্তি বা অসম্মানজনক মন্তব্য করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরই প্রশ্ন উঠেছিল, অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধেও কি পুলিশি পদক্ষেপ করা হবে? যদিও মুখ্যমন্ত্রী কোনও ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, আইন সবার জন্য সমান এবং কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের ভিত্তিতে নিয়ম মেনেই পদক্ষেপ করা হবে বলে তিনি স্পষ্ট করে দেন।
এর পরের দিনই বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সামনে আসায় ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যে সম্মান রাজ্যের তরফে কয়েক মাস আগেই অনন্ত মহারাজকে দেওয়া হয়েছিল, এবার সেই সম্মানই ফিরিয়ে নেওয়া হল। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বিজ্ঞপ্তির পর রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে।
বঙ্গবিভূষণ রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সম্মান। তাই একজন বর্তমান রাজ্যসভার সাংসদের কাছ থেকে এই সম্মান প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সম্মান দেওয়ার পর বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তা প্রত্যাহারের ঘটনা বাড়তি নজর কেড়েছে।
অনন্ত মহারাজ অবশ্য তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আগেই দাবি করেছিলেন, তিনি কাউকে অপমান বা বদনাম করেননি এবং ইতিহাসের কথাই বলেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পরও তাঁর সঙ্গে সরাসরি কোনও কথা হয়নি বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
এখন বঙ্গবিভূষণ প্রত্যাহারের পর অনন্ত মহারাজের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেটাই দেখার। পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে পুলিশি তদন্ত কতদূর এগোয়, সেদিকেও নজর থাকবে। তবে বৃহস্পতিবারের সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট হয়ে গেল, নেতাজিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের ঘটনায় অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিল শুভেন্দু সরকার।



