এনআরএসে নার্সের রহস্যমৃত্যু, ময়নাতদন্ত অন্য হাসপাতালে চাইলেন স্বামী; তদন্তে লালবাজার

এনআরএসের এইচডিইউ শৌচাগারে কর্তব্যরত নার্সের রহস্যমৃত্যু ঘিরে তদন্তে নেমেছে কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখা। ময়নাতদন্ত অন্য হাসপাতালে চেয়েছেন মৃতার স্বামী।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: এনআরএস মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের (NRS Medical College and Hospital) শৌচাগারে নার্সের রহস্যমৃত্যু ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে এনআরএসে ময়নাতদন্ত না করার আবেদন জানিয়েছেন তাঁর স্বামী রাহুল দাস। ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল সিল করে তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ।

বুধবার রাতে কর্তব্যরত অবস্থাতেই মৃত্যু হয় ওই নার্সের। রাতের ডিউটিতে মেটারনিটি বিভাগের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (HDU) ছিলেন তিনি। রাত প্রায় ১০টা ২০ মিনিট নাগাদ শৌচাগারে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় কেটে গেলেও তিনি ফিরে না আসায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়।

বারবার ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত শৌচাগারের দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকেন সহকর্মীরা। সেখানেই অচৈতন্য অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনার খবর পেয়ে এন্টালি থানার পুলিশ হাসপাতালে পৌঁছে তদন্ত শুরু করে।

প্রাথমিক তদন্তে এখনও মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ স্পষ্ট নয়। পুলিশের হাতে এমন কোনও সুইসাইড নোটও আসেনি। একই সঙ্গে শরীরে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানা গিয়েছে। ফলে ঘটনাটি নিছক অসুস্থতাজনিত মৃত্যু, আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনও কারণে—তা নিয়েই তদন্তকারীদের সামনে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, শৌচাগারে যাওয়ার আগে ওই নার্সের সঙ্গে ফেন্টানিলের কয়েকটি ভায়াল ছিল। চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান, ওষুধের প্রভাবে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি কীভাবে ঘটেছে, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্ত এবং ফরেন্সিক পরীক্ষার রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না পুলিশ।

এই জায়গাতেই আপত্তি তুলেছেন মৃত নার্সের স্বামী। তাঁর বক্তব্য, যে হাসপাতালে তাঁর স্ত্রী কর্মরত ছিলেন, সেই এনআরএসেই যেন দেহের ময়নাতদন্ত না করা হয়। অন্য কোনও হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করানোর আর্জি তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে জানিয়েছেন।

পরিবারের এই আপত্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। প্রাথমিক ভাবে জানানো হয়েছে, মৃতের পরিবারের ইচ্ছা অনুযায়ী ময়নাতদন্তের স্থান নির্ধারণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে। কোথায় ময়নাতদন্ত হবে, তা নিয়ে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলছে।

ঘটনার গুরুত্ব বুঝে বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালে পৌঁছন রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। পাশাপাশি লালবাজার থেকেও পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরা এনআরএসে যান। ঘটনাস্থলে পৌঁছন কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কুণাল অগ্রবাল এবং ডিসি (পূর্ব শহরতলি) সুবিমল পাল।

কলকাতা পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ঘটনাস্থল ইতিমধ্যেই সিল করে দেওয়া হয়েছে। হোমিসাইড শাখাও তদন্তে নেমেছে। তদন্তকারীরা হাসপাতালের একাধিক জায়গার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘটনার আগের ও পরের গতিবিধি যাচাই করছেন।

পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তদন্তের আওতায় মোট তিনটি সম্ভাব্য ঘটনাস্থল রাখা হয়েছে এবং তিনটিই সিল করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি স্ট্রেচারও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। নার্সের শেষ কয়েক ঘণ্টার গতিবিধি, সহকর্মীদের বক্তব্য এবং হাসপাতালের নজরদারি ব্যবস্থার তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

মৃত নার্সের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তাঁর সাম্প্রতিক যোগাযোগ, ফোনে কথাবার্তা এবং ঘটনার আগে-পরে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবার ও সহকর্মীদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।

সূত্রের খবর, ওই নার্সের সম্প্রতি বিয়ে হয়েছিল। ফলে ব্যক্তিগত জীবনে কোনও সমস্যা ছিল কি না, কর্মক্ষেত্রে কোনও চাপ বা বিরোধ তৈরি হয়েছিল কি না—এই বিষয়গুলিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, যার ভিত্তিতে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে নিশ্চিত করা যায়। একইভাবে অপরাধের সম্ভাবনাও এখনই উড়িয়ে দিচ্ছে না তদন্তকারীরা।

ঘটনাটি ঘিরে এনআরএসের নিরাপত্তা ও হাসপাতালের কর্মীদের কর্মপরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনও সম্ভাবনাকেই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখছে না পুলিশ। বিশেষ করে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ফরেন্সিক তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ—এই তিনটি দিক থেকেই তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়ার আশা করছেন।

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কেন ওই নার্স শৌচাগারে গিয়েছিলেন, সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল এবং তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী। পরিবারের আপত্তির পরে শেষ পর্যন্ত কোথায় ময়নাতদন্ত হয় এবং সেই রিপোর্টে কী উঠে আসে, তার দিকেই নজর রয়েছে। আপাতত রহস্য কাটেনি; তদন্ত এগোলেই মৃত্যুর নেপথ্যের আসল কারণ স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন