নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chandra Bose)-কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে রাজনৈতিক চাপ বাড়তেই এবার নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নেতাজিকে নিয়ে কুরুচিকর বা অপমানজনক মন্তব্য করলে রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তার পরেই অনন্ত মহারাজের দাবি, তিনি কারও নামে বদনাম করেননি, ইতিহাসের কথাই বলেছেন।
গত কয়েক দিন ধরে নেতাজিকে ঘিরে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক চলছে। দিনহাটার একটি কর্মসূচির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনন্ত মহারাজ নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা নিয়ে একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে বিভিন্ন থানায় অভিযোগও দায়ের হয়েছে। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর বুধবারের কড়া বার্তার পর তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
দিনহাটায় অনন্ত মহারাজ দাবি করেছিলেন, কোচবিহারের মহারাজা যুদ্ধ করে হিটলার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাস্ত করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর আন্দোলনের ফলেই যদি ভারত স্বাধীন হয়ে থাকে, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য দেশ কীভাবে স্বাধীন হল। নেতাজির নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এর পর আরও একাধিক মন্তব্য করেন বিজেপি সাংসদ। তাঁর দাবি ছিল, ব্রিটিশ সেনাদের জার্মানি বন্দি করে পরে নেতাজির হাতে তুলে দিয়েছিল এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। এমনকি কোচবিহারের মহারাজাকে দেশের সম্রাট করা হলে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরেই শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া।
বিতর্কের মধ্যেই বুধবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি কোনও ব্যক্তির নাম না করলেও স্পষ্ট করে দেন, নেতাজি সম্পর্কে কুরুচিকর বা অপমানজনক মন্তব্য বরদাস্ত করা হবে না। পুলিশ ও সাইবার সেলকে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এমন মন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে গ্রেফতারির মতো কঠোর পদক্ষেপও করা হতে পারে বলে মুখ্যমন্ত্রী বার্তা দেন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধেও কি একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে? সাংবাদিকদের সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গিয়ে শুভেন্দু বলেন, আইন সবার জন্য সমান। অর্থাৎ অভিযুক্ত ব্যক্তি সাংসদ, বিধায়ক বা অন্য কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ে থাকলেও অভিযোগের ভিত্তিতে আইন নিজের পথেই চলবে।
এই পরিস্থিতিতে অনন্ত মহারাজের বক্তব্যে অবশ্য গ্রেফতারি নিয়ে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। বরং নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তিনি জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী কী বলেছেন, সেটা তাঁর বিষয়। তিনি কোনও মিথ্যা বা মনগড়া কথা বলেননি বলেই দাবি তাঁর। তাঁর বক্তব্য, কারও নামে বদনাম করার উদ্দেশ্য ছিল না এবং কাউকে গালাগালিও করেননি।
অনন্ত মহারাজ আরও জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর কোনও কথা হয়নি। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর কড়া বার্তার পর সরাসরি কোনও আলোচনা হয়েছে কি না, সেই সম্ভাবনাও তিনি খারিজ করেছেন। তাঁর দাবি, তিনি যা বলেছেন, তা ইতিহাসের ভিত্তিতেই বলেছেন।
তবে রাজনৈতিক মহলে এই বিতর্কের গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজের ভূমিকা নিয়ে মন্তব্যটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন রাজ্য সরকার প্রকাশ্যেই নেতাজিকে নিয়ে কটূক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে। ফলে অনন্ত মহারাজের বক্তব্যকে ঘিরে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি এখন নজরে থাকবে।
সব মিলিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির পর অনন্ত মহারাজ সরাসরি নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার না করলেও ভাষার ক্ষেত্রে ব্যাখ্যামূলক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন, কাউকে অপমান বা বদনাম করার উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেননি। এখন তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ও প্রশাসন কী পদক্ষেপ করে, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



