রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর এবার সংগঠন ‘শুদ্ধিকরণে’ বড়সড় পদক্ষেপের পথে বঙ্গ বিজেপি (Bengal BJP)। নিচুতলায় তোলাবাজি, দলবিরোধী কাজ এবং গোষ্ঠীকোন্দলের অভিযোগ সামলাতে ইতিমধ্যেই বহু কর্মী-সমর্থকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার সেই নজর পড়েছে জেলা নেতৃত্বের উপরেও। দলীয় সূত্রের খবর, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে খুব শীঘ্রই ১২ জনের বেশি জেলা সভাপতিকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। একইসঙ্গে ২০০-র বেশি মণ্ডল সভাপতির পদেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজেপি সূত্রের খবর, রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের নিচুতলায় অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ ক্রমশ বাড়ছিল। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার প্রকাশ্যে কড়া বার্তা দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে ইতিমধ্যেই আড়াইশোর বেশি নেতা-কর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
কিন্তু শুধু নিচুতলায় ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলে মনে করছে রাজ্য নেতৃত্ব। কারণ, যে জেলা সভাপতিদের উপর সংগঠন নিয়ন্ত্রণ এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব, তাঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধেই নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এসেছে বলে সূত্রের দাবি। অভিযোগ, নিচুতলায় যাঁদের বিরুদ্ধে অনৈতিক কাজকর্মের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সঙ্গে কয়েকজন জেলা সভাপতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে সংশ্লিষ্ট নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয় স্তরে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে রিপোর্ট পৌঁছেছে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই জেলা সংগঠনে বড়সড় রদবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে খবর। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১২ জনের বেশি জেলা সভাপতির পদে পরিবর্তন হতে পারে।
জেলা সভাপতিদের পাশাপাশি এবার মণ্ডল স্তরেও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। দলীয় সূত্রের খবর, ২০০-র বেশি মণ্ডল সভাপতিকে সরিয়ে নতুন মুখ আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অর্থাৎ জেলা থেকে মণ্ডল—দুই স্তরেই সংগঠনের কাঠামোয় ব্যাপক রদবদল হতে চলেছে।
এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের অন্দরের বৈঠকে ঠিক হয়েছে, সম্প্রতি বিজেপিতে যোগ দেওয়া ‘হঠাৎ বিজেপি’দের পুরসভা নির্বাচনে টিকিট দেওয়া হবে না। বিশেষ করে প্রাক্তন তৃণমূল নেতাকর্মীদের একটি অংশ ভোটের আগে বা পরে বিজেপিতে যোগ দিয়ে স্থানীয় সংগঠনে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, বহু এলাকায় বিজেপির নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি এখনও যথেষ্ট মজবুত না হওয়ায় স্থানীয় স্তরে দলবদল করে আসা নেতাদের উপর নির্ভর করতে হয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগে কয়েকজন ‘হঠাৎ বিজেপি’ স্থানীয় এলাকায় দাপট দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ। এবার পুরসভা নির্বাচনের টিকিট পাওয়ার জন্য তাঁরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এই পরিস্থিতি আটকাতেই শীর্ষ নেতৃত্ব কড়া অবস্থান নিতে চাইছে।
দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি এবং আসানসোল-সহ একাধিক এলাকা থেকে নিচুতলার সংগঠন নিয়ে অভিযোগ পৌঁছেছে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে। বিভিন্ন জেলায় বিজেপির একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাতও প্রকাশ্যে এসেছে। হাওড়া থেকে হুগলি—বিভিন্ন জায়গায় দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, বিক্ষোভ এবং হাতাহাতির মতো ঘটনাও সামনে এসেছে বলে সূত্রের খবর।
এই গোষ্ঠীকোন্দলে অস্বস্তিতে বিজেপির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-ও। সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই দলীয় কাঠামো শক্তিশালী করার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে খবর। সেই লক্ষ্যেই আগামী দিনে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে।
আগামী ২২ থেকে ৩০ অগস্ট বিভিন্ন জেলায় বিজেপির প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করা হবে। সেই শিবিরে যাঁরা বক্তা হিসেবে থাকবেন, তাঁদের প্রশিক্ষণ হবে ১৬ অগস্ট। ওই কর্মসূচিতে বিজেপির সর্বভারতীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) শিবপ্রকাশ (Shiv Prakash) এবং রাজ্য পর্যবেক্ষক সুনীল বনশল (Sunil Bansal) উপস্থিত থাকবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
দলীয় সূত্রের দাবি, এই প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হওয়ার পরই জেলা সংগঠনে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জেলা সভাপতি বদলের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহে বঙ্গ বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় একাধিক বড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। জেলা সভাপতি থেকে মণ্ডল সভাপতি এবং পুরসভা নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই—সব ক্ষেত্রেই এবার আনুগত্য, সংগঠন ও দলীয় শৃঙ্খলাকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে চাইছে রাজ্য নেতৃত্ব।



