দুর্গাপুজোর আগে ‘পুজো পরিক্রমা’ বা ‘প্রিভিউ শো’-এর নামে পাস বিক্রিতে কোটি কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। সেই মামলার তদন্তে মঙ্গলবার সকালেই প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের কসবার বাড়িতে তল্লাশি শুরু করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। একইসঙ্গে কলকাতার একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালাচ্ছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা।
ইডি সূত্রে জানা যাচ্ছে, কসবার পাশাপাশি হিন্দুস্তান পার্ক, হাইল্যান্ড পার্ক-সহ কলকাতার বিভিন্ন ঠিকানায় অভিযান চলছে। ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়দের বাড়ির পাশাপাশি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির বাড়িতেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে খবর। হুগলির সিঙ্গুরে ইন্দ্রনীলের বাগানবাড়ি ‘মোহর’-এও তদন্তকারীরা পৌঁছেছেন বলে আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে ‘মাস আর্ট’ নামে একটি সংস্থা। অভিযোগ, কলকাতার দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’ বা পুজো পরিক্রমার নামে ওই সংস্থার মাধ্যমে চড়া দামে পাস বিক্রি করা হত। তদন্তকারী সংস্থার সূত্রের দাবি, এই পাস বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। তবে এই অঙ্ক এখনও তদন্তাধীন এবং অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা তদন্তের ফলাফলের উপর নির্ভরশীল।
এই ঘটনায় গত জুন মাসে বৌবাজার থানায় ইন্দ্রনীল সেন, তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা সেন এবং ‘মাস আর্ট’-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে। মধুছন্দার ওই সংস্থার সঙ্গে যোগ রয়েছে বলেও তদন্তকারী সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহারের বিষয়টি। কলকাতার দুর্গাপুজো ২০২১ সালে ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ স্বীকৃতি পাওয়ার পর কয়েক মাসের মধ্যে ‘মাস আর্ট’ তৈরি হয় বলে অভিযোগ। সংস্থাটি কলকাতার দুর্গাপুজোর প্রচারের ক্ষেত্রে নিজেদের ইউনেস্কোর ‘অফিশিয়াল পার্টনার’ বলে দাবি করেছিল বলে তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে। সেই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুমতি ছাড়া ইউনেস্কোর নাম ও লোগো ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, কলকাতার প্রায় ২৪টি দুর্গাপুজোর ‘প্রিভিউ শো’-এর পাস বিক্রি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পাসগুলির দাম ছিল ১,৭৪৯ টাকা থেকে ৫,৪৯৯ টাকা পর্যন্ত। প্রচারে দাবি করা হয়েছিল, ইউনেস্কোর তরফে ওই ২৪টি পুজোমণ্ডপ বাছাই করা হয়েছে। কিন্তু সেই দাবির কোনও প্রামাণ্য ভিত্তি এখনও পাওয়া যায়নি বলে তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
পাসের চাহিদা কতটা ছিল, তার একটি ধারণা মিলেছে রেজিস্ট্রেশনের হিসাব থেকেও। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ১৯ হাজার মানুষ, ২০২৩ সালে প্রায় ৩৪ হাজার এবং ২০২৪ সালে প্রায় ৬১ হাজার মানুষ এই পাসের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। বিপুল সংখ্যক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে কত টাকা সংগ্রহ হয়েছিল এবং সেই অর্থ কোথায় গিয়েছিল, সেটিই এখন ইডির তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে জানা যাচ্ছে।
ইডি এখন মূলত পাস বিক্রির টাকা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির আর্থিক লেনদেন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে ওই সংস্থার আর্থিক বা সাংগঠনিক যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে বলে সূত্রের খবর। মঙ্গলবারের তল্লাশিতে কী কী নথি বা ডিজিটাল তথ্য তদন্তকারীদের হাতে আসে, সেদিকেও নজর রয়েছে।
তবে ইডির তল্লাশি মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়। তদন্ত এখনও চলছে। ইন্দ্রনীল সেন বা অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হয়নি। তদন্তের পরেই এই মামলায় আর্থিক অনিয়মের প্রকৃত পরিমাণ এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা স্পষ্ট হবে।



