অর্ক সানা: অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, সীমান্তবাসীর উদ্বেগ এবং চিনা বাহিনীর কথিত গতিবিধির অভিযোগ নতুন করে দেশের সামনে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—সীমান্তে ঠিক কী ঘটছে? অরুণাচলের কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় চিনা বাহিনীর অনুপ্রবেশ ও পরিকাঠামো তৈরির অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সংগঠনগুলি উদ্বেগ জানিয়েছে। ভারতীয় সেনা সেই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেছে। কিন্তু তারপরও সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—সত্যিটা জানাবে কে?
এই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। সামাজিক মাধ্যমে কোনও ভিডিও ভাইরাল হলেই তাকে অরুণাচল দখলের প্রমাণ বলা যায় না। একই ভাবে কোনও অভিযোগকে শুধু ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিলেও সীমান্তবাসীর উদ্বেগের উত্তর পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের কাছে তথ্য, গোয়েন্দা রিপোর্ট, উপগ্রহচিত্র এবং সীমান্ত পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ ছবি থাকলে সেই তথ্যের ভিত্তিতেই দেশবাসীকে স্পষ্ট করে জানানো উচিত।
কারণ অরুণাচল প্রদেশ কোনও সাধারণ রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটি ভারতের সার্বভৌমত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন। চিন দীর্ঘদিন ধরেই অরুণাচলকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এসেছে। অন্যদিকে ভারত বারবার স্পষ্ট করেছে, অরুণাচল প্রদেশ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত টাকসিংকে ঘিরে। জুনে আপার সুবানসিরি জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি অভিযোগ করেছিল, চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (PLA) ভারতীয় ভূখণ্ডে নিজেদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং কিছু এলাকায় রাস্তা, সেতু ও সামরিক পরিকাঠামো তৈরি করেছে। সংগঠনটি কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকার নামও উল্লেখ করেছিল।
অভিযোগটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে কারণ স্থানীয় সংগঠনটি দাবি করেছিল, ওই এলাকাগুলির কিছু অংশ আগে স্থানীয় মানুষ শিকার, পশুচারণ ও বনজ সম্পদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করতেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সীমান্তের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না করলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
কিন্তু ভারতীয় সেনার বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২৯ জুন সেনা স্পষ্ট জানায়, অরুণাচলে চিনা বাহিনীর সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশ বা নতুন শিবির তৈরির যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা “incorrect and without any basis”। অর্থাৎ সেনার অবস্থান—সাম্প্রতিক চিনা অনুপ্রবেশের অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই।
এখানেই সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি তৈরি হয়।
এক পক্ষ বলছে, সীমান্তে সমস্যা হচ্ছে। অন্য পক্ষ বলছে, অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। তাহলে দেশের মানুষ জানবে কীভাবে—আসল সত্যিটা কী?
সম্প্রতি অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু (Pema Khandu)-ও নতুন করে চিনা অনুপ্রবেশের খবর অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি সেনা ও স্থানীয় সংগঠনগুলির সঙ্গে কথা বলে যাচাই করা হবে। পরে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, চিনা অনুপ্রবেশের কোনও ঘটনা ঘটেনি এবং ভারতীয় সেনা সীমান্ত রক্ষা করছে।
অর্থাৎ “চিন অরুণাচল দখল করে নিচ্ছে”—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এই মুহূর্তে নেই। এই সত্যটিও আমাদের বলতে হবে। কিন্তু তার সঙ্গে আরও একটি সত্য বলতে হবে—সীমান্তবাসীর উদ্বেগকে উপেক্ষা করারও কোনও কারণ নেই।
কারণ সীমান্তের মানুষ রাষ্ট্রের সবচেয়ে দূরের নাগরিক নন; বরং তাঁরা রাষ্ট্রের সবচেয়ে সামনের সারির নাগরিক। তাঁদের চোখে যদি কোনও পরিবর্তন ধরা পড়ে, তাঁদের এলাকায় যদি কোনও অস্বাভাবিক গতিবিধি দেখা যায়, তাঁরা যদি প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানান, সেই অভিযোগ যাচাই করা সরকারের দায়িত্ব।
অভিযোগ মিথ্যা হলে তদন্ত করে তা প্রমাণ করুন। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিন। কিন্তু মানুষকে অন্ধকারে রেখে দিলে সন্দেহই বাড়বে।
আজ সামাজিক মাধ্যমে এমন ভিডিও ছড়াচ্ছে যেখানে সীমান্তবাসীর আতঙ্ক, প্রতিবাদ কিংবা চিনা বাহিনীর উপস্থিতির দাবির কথা বলা হচ্ছে। কোথাও মানুষ লাঠি, ঝাঁটা হাতে প্রতিবাদ করছেন—এমন দাবিও সামনে আসছে। কিন্তু প্রতিটি ভিডিওর উৎস, সময়, স্থান এবং প্রেক্ষাপট যাচাই না করে সেগুলিকে সত্য বলে প্রচার করা সাংবাদিকতার কাজ নয়।
বরং প্রশ্নটা আরও বড় করে তোলা দরকার—সীমান্তে ভারতীয় রাষ্ট্রের উপস্থিতি কতটা দৃশ্যমান? সীমান্ত পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব অবশ্যই সেনার। কিন্তু শুধু সেনা থাকলেই সীমান্ত নিরাপদ হয় না। সীমান্তে রাস্তা চাই, যোগাযোগ চাই, প্রশাসনিক উপস্থিতি চাই, স্বাস্থ্য পরিষেবা চাই, শিক্ষা চাই, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ চাই। সবচেয়ে বড় কথা, সীমান্তবাসীর মনে এই বিশ্বাস থাকা দরকার যে দিল্লি তাঁদের কথা শুনছে।
চিন সীমান্তবর্তী এলাকায় পরিকাঠামো তৈরিতে যে গুরুত্ব দিয়েছে, তা কোনও গোপন বিষয় নয়। তাই ভারতের লড়াই শুধু সেনা বনাম সেনার নয়। এটি পরিকাঠামোর লড়াই, জনসংখ্যার উপস্থিতির লড়াই, কূটনৈতিক লড়াই এবং তথ্যের লড়াইও।
এখানে সরকারের কাছে একটি সরল প্রশ্ন থাকতেই পারে—যদি অরুণাচলে চিনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে না কেন?
সীমান্ত সংক্রান্ত সব সামরিক তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়, সেটা আমরা বুঝি। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু তথ্য গোপন রাখতেই হয়। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নীরবতা দিয়ে দিতে হবে।
বরং একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ হল—যে তথ্য প্রকাশ করা নিরাপদ, সেই তথ্য প্রকাশ করা; যে অভিযোগ মিথ্যা, তার খণ্ডন করা; আর যে বিষয় তদন্তাধীন, তার তদন্তের অগ্রগতি জানানো। আর এখানেই রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
অরুণাচল নিয়ে যদি সত্যিই জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বিরোধীদেরও মুখ খুলতে হবে। সংসদে প্রশ্ন তুলতে হবে। কেন্দ্রের কাছে তথ্য চাইতে হবে। সীমান্তবাসীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে হবে।
সরকারেরও বিরোধীদের প্রশ্নকে রাজনৈতিক আক্রমণ হিসেবে না দেখে জাতীয় নিরাপত্তার আলোচনার অংশ হিসেবে নেওয়া উচিত।
কারণ চিনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে দলীয় বিভাজনের চেয়ে জাতীয় ঐকমত্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আজ যদি কোনও ভারতীয় নাগরিক বলেন, “আমাদের জমি কি নিরাপদ?”, তাঁর প্রশ্নের উত্তর বিজেপি, কংগ্রেস বা অন্য কোনও দলের হয়ে নয়—ভারত সরকারের হয়ে দেওয়া উচিত।
আর যদি সত্যিই কোথাও ভারতীয় ভূখণ্ডে চিনা বাহিনীর কোনও নতুন উপস্থিতি না থাকে, তাহলে দেশের সামনে সেই সত্যিটা আরও জোর দিয়ে তুলে ধরা হোক।
কিন্তু যদি কোনও এলাকায় সীমান্তের পরিস্থিতি বদলে গিয়ে থাকে, যদি কোনও জায়গায় চিন পরিকাঠামো তৈরি করে থাকে, যদি স্থানীয় মানুষের চলাচল বা চারণভূমি ব্যবহারের অধিকার কোনওভাবে সংকুচিত হয়ে থাকে—তাহলে সেটিও দেশের মানুষকে জানানো প্রয়োজন।
কারণ দেশের জমি নিয়ে প্রশ্নে নীরবতা কখনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।
আর একটা কথা বিশেষ ভাবে বলা দরকার—অরুণাচলের মানুষকে তাঁদের ভারতীয় পরিচয় নিয়ে আশঙ্কায় ভুগতে হবে, এমন পরিস্থিতি কোনওভাবেই কাম্য নয়। সীমান্তের মানুষ যদি ভাবতে শুরু করেন, “আমরা কি নিরাপদ?”, তাহলে সেই ভয় দূর করার দায়িত্ব সরকারের।
চিনের সঙ্গে যুদ্ধ চাই না। উত্তেজনা চাই না। কিন্তু সীমান্তের প্রশ্নে দৃঢ়তা অবশ্যই চাই।
চিনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে, সীমান্ত বৈঠক চলবে, আলোচনা চলবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও অস্পষ্টতা থাকা চলবে না।
তাই আজ প্রশ্নটা শুধু, “চিন কি অরুণাচল দখল করছে?”—এতটুকু নয়।
প্রশ্ন আরও গভীর।
সীমান্তে কী ঘটছে?
সীমান্তবাসীর অভিযোগের সত্যতা কী?
ভারতীয় সেনার বক্তব্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা কোথায়?
কেন্দ্রের অবস্থান কী?
আর বিরোধী দলগুলি এই জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোথায় দাঁড়িয়ে?
অরুণাচল ভারতের—এই কথাটি বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই দাবিকে বাস্তবে শক্তিশালী করতে হয় সীমান্তে উপস্থিতি দিয়ে, উন্নয়ন দিয়ে, নিরাপত্তা দিয়ে এবং সবচেয়ে বেশি—সীমান্তবাসীর আস্থা দিয়ে।
আজ যদি অরুণাচলের কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ দিল্লির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, “আমাদের জমি, আমাদের ঘর, আমাদের ভবিষ্যৎ—সব কি নিরাপদ?”, তাঁর উত্তর পাওয়ার অধিকার আছে।
সরকারের কাছে সেই উত্তর চাওয়া রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। বিরোধীদের কাছে সেই প্রশ্ন তোলা রাজনীতি নয়।
এটি ভারতের সীমান্তের প্রশ্ন।
এটি ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
এবং এই প্রশ্নে নীরব থাকার সময় আর নেই।



