মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কক্রোচ জনতা পার্টি (CJP)-র প্রস্তাবিত বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। ১০ অক্টোবরের কর্মসূচির আগে নতুন দিল্লি এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (BNSS) ১৬৩ ধারা কার্যকর রয়েছে। এই ধারায় অনুমতি ছাড়া জমায়েত, মিছিল, ধর্না ও বিক্ষোভের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। CJP-র কর্মসূচির জন্য যন্তর মন্তরে অনুমতিও দেয়নি দিল্লি পুলিশ। কিন্তু BNSS-এর ১৬৩ ধারা ঠিক কী, এই নির্দেশে সাধারণ মানুষের উপর কী বিধিনিষেধ রয়েছে এবং নিয়ম ভাঙলে কী হতে পারে?
দিল্লি পুলিশের বক্তব্য, বিক্ষোভের অনুমতি চেয়ে আবেদন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে জমা পড়েছিল। পুলিশের দাবি, যন্তর মন্তরে কর্মসূচির জন্য সাধারণত অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন করতে হয়। আগের একটি বিক্ষোভে নির্ধারিত শর্ত ও নির্দেশ মানা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা, জননিরাপত্তা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার যুক্তিতে CJP-র আবেদন খারিজ করা হয়েছে।
BNSS-এর ১৬৩ ধারা কী?
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা হল জরুরি পরিস্থিতিতে প্রতিরোধমূলক নির্দেশ জারির একটি আইনি বিধান। পুরনো ফৌজদারি কার্যবিধি বা CrPC-র ১৪৪ ধারার পরিবর্তে ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া BNSS-এ এই বিধান এসেছে। সম্ভাব্য বিপদ, জননিরাপত্তার ঝুঁকি, শান্তিভঙ্গ বা অন্য নির্দিষ্ট আশঙ্কা ঠেকাতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এই ধারায় লিখিত নির্দেশ দিতে পারেন।
এই ধারার অর্থ এমন নয় যে, গোটা দিল্লিতে সব ধরনের জমায়েত বা চলাফেরা নিষিদ্ধ। কোথায়, কত দিনের জন্য এবং কোন কোন কাজের উপর বিধিনিষেধ থাকবে, তা সংশ্লিষ্ট নির্দেশের শর্তের উপর নির্ভর করে। বর্তমান ক্ষেত্রে নতুন দিল্লি এলাকার নিষেধাজ্ঞা ও বিক্ষোভের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
১৬৩ ধারা জারি থাকলে কী করা যাবে না?
দিল্লির নতুন দিল্লি এলাকায় জারি থাকা নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, আগাম লিখিত অনুমতি ছাড়া একাধিক জনসমাগম ও বিক্ষোভমূলক কার্যকলাপের উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। প্রকাশিত নির্দেশের বিবরণ অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে—
- পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত: অনুমতি ছাড়া এমন জনসমাবেশ করা যাবে না।
- মিছিল ও বিক্ষোভ: আগাম লিখিত অনুমতি ছাড়া মিছিল, প্রতিবাদ কর্মসূচি বা প্রদর্শনী করা নিষিদ্ধ।
- ধর্না ও পিকেটিং: অনুমতি ছাড়া ধর্না বা পিকেটিংয়ের মতো কর্মসূচি করা যাবে না।
- স্লোগান ও বক্তৃতা: নির্দেশে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ অনুযায়ী, আগাম লিখিত অনুমতি ছাড়া প্রকাশ্যে স্লোগান দেওয়া বা বক্তৃতা করাও নিষিদ্ধ হতে পারে।
তবে বিধিনিষেধের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ সংশ্লিষ্ট আদেশের ভাষা ও কার্যকর এলাকার উপর নির্ভরশীল। তাই কোনও নির্দিষ্ট জায়গায় যাওয়ার বা কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ জেনে নেওয়া জরুরি।
সাধারণ মানুষের উপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
১৬৩ ধারা কার্যকর থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জমায়েত নিয়ন্ত্রণ, ব্যারিকেড, যান চলাচলে পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা তল্লাশির মতো ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে যন্তর মন্তর, পার্লামেন্ট স্ট্রিট এবং আশপাশের রাস্তায় যাতায়াতের আগে ট্র্যাফিক পুলিশের নির্দেশ দেখে নেওয়া উচিত। তবে এই ধারার অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক বাসিন্দার স্বাভাবিক চলাফেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
দিল্লি পুলিশের নিষেধাজ্ঞা এবং CJP-র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নেওয়া অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। কোনও নির্দিষ্ট রাস্তা বন্ধ, যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়া বা মেট্রো পরিষেবায় পরিবর্তনের নির্দেশ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পৃথক ঘোষণার ভিত্তিতে কার্যকর হবে।
নিয়ম ভাঙলে কী হতে পারে?
কার্যকর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জমায়েত বা নিষিদ্ধ কর্মসূচিতে অংশ নিলে পরিস্থিতি ও ঘটনার প্রকৃতি অনুযায়ী পুলিশ আইনি পদক্ষেপ করতে পারে। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ধরনের শাস্তি হবে, এমন নয়। কী নির্দেশ জারি রয়েছে, সেই নির্দেশ কীভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে এবং অন্য কোনও আইন ভাঙা হয়েছে কি না—তার উপর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: ১৬৩ ধারা জারি হলেই কোনও ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধী হয়ে যান না। নিষেধাজ্ঞার আওতা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার তথ্য বিবেচনা করেই আইন প্রয়োগ করতে হয়।
প্রতিবাদ করার অধিকার কি বন্ধ হয়ে যায়?
ভারতীয় সংবিধান নাগরিকদের শান্তিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশ ও সমবেত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। তবে এই অধিকার নিরঙ্কুশ নয়; আইনসম্মত ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে। একই সঙ্গে, এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয়তা, পরিস্থিতি এবং আইনি সীমার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
সুপ্রিম কোর্ট অতীতে CrPC-র ১৪৪ ধারার প্রয়োগ নিয়ে একাধিক মামলায় বলেছে, প্রতিরোধমূলক ক্ষমতা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করা যায় না। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ সংক্রান্ত একটি মামলায় আদালত সমস্ত প্রতিবাদ একেবারে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে নিয়ম মেনে অনুমতির ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছিল। BNSS-এর ১৬৩ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নির্দেশ ও তার আইনি ভিত্তি তাই গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, CJP-র প্রস্তাবিত বিক্ষোভের আগে নতুন দিল্লি এলাকায় BNSS-এর ১৬৩ ধারা কার্যকর থাকায় অনুমতি ছাড়া জমায়েত, মিছিল ও ধর্নার উপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে এটিকে গোটা দিল্লিতে সর্বাত্মক কার্ফু হিসেবে দেখা ঠিক নয়। সাধারণ মানুষের উচিত সংশ্লিষ্ট এলাকার সরকারি নির্দেশ, ট্র্যাফিক আপডেট এবং অনুমতির নিয়ম মেনে চলা।



