নজরবন্দি ব্যুরো: রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সামরিক সহযোগিতা নতুন মাত্রা নিচ্ছে বলে দাবি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির (Volodymyr Zelenskyy)। তাঁর অভিযোগ, ইউক্রেনে সাম্প্রতিক রুশ হামলায় উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার হয়ে আরও ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি।
সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণেও বিষয়টি সামনে এনেছিলেন জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, রাশিয়া এখন উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ও সেনার উপর ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এমনকি প্রথমবারের মতো মস্কো উত্তর কোরিয়ার সহায়তা ছাড়া যুদ্ধ চালাতে পারছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মঙ্গলবারের রাতভর হামলায় ইউক্রেনের একাধিক শহরকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ে রাশিয়া। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ১২০টিরও বেশি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। কিয়েভ, জাপোরিঝঝিয়া-সহ একাধিক এলাকায় হামলার খবর মিলেছে।
জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ হামলায় অন্তত ছয় জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হয়েছেন বলে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। জেলেনস্কির দাবি, ওই হামলায় উত্তর কোরিয়ার তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, হামলার লক্ষ্য ছিল বিশেষ করে অসামরিক পরিকাঠামো।
কিয়েভেও রাতভর একাধিকবার সাইরেন বেজেছে। শহরের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো (Vitali Klitschko) জানান, রাজধানীর দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছিল। একটি শিশুদের হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেখানে আশ্রয় নেওয়া রোগী ও কর্মীদের কোনও ক্ষতি হয়নি বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার হামলায় বিদ্যুৎ পরিকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খেরসন ও খারকিভের কয়েকটি সাবস্টেশনে হামলার পর বিদ্যুৎ পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটে বলে জেলেনস্কি জানিয়েছেন। রাজধানীর উপকণ্ঠে একটি গুদামে আগুন লাগার খবরও পাওয়া গিয়েছে।
শুধু কিয়েভ বা জাপোরিঝঝিয়া নয়, সুমি এলাকাতেও রুশ ড্রোন হামলায় দুই মহিলা আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। তাঁদের বয়স ৫২ ও ৬৬ বছর। ঘটনাস্থলেই তাঁদের চিকিৎসা করা হয়। হামলায় কয়েকটি গাড়ি, গুদাম এবং পরিকাঠামোগত স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রশাসনের দাবি।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা নিয়ে জেলেনস্কির উদ্বেগ আরও বাড়ছে। গত ৫ আগস্ট ইউক্রেনীয় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল, প্রায় ৯০ সদস্যের একটি উত্তর কোরীয় ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে মোতায়েন হয়েছে। ওই ইউনিটের কাছে উত্তর কোরিয়ার তৈরি প্রায় ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার থাকতে পারে বলে দাবি করা হয়েছিল।
এর পাশাপাশি রাশিয়ায় আরও ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে সম্প্রতি দাবি করেছেন জেলেনস্কি। তাঁর বক্তব্য, এই সহযোগিতা শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের নিরাপত্তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
জেলেনস্কির যুক্তি, রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সেনা ও অস্ত্র ব্যবহারের ফলে পিয়ংইয়ংও যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। একই সঙ্গে রুশ সামরিক প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন এবং যুদ্ধকৌশলের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।
মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনাদের অংশগ্রহণের কথা আগেই প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি ইউক্রেন দাবি করেছে, রাশিয়ার হয়ে উত্তর কোরিয়া থেকে আরও অস্ত্র ও সেনা সহায়তা বাড়ছে।
জেলেনস্কির বক্তব্য, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো, উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ও সেনা আনা এবং নতুন করে সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে মস্কো শান্তির বদলে সংঘাত আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাই রাশিয়ার উপর আরও নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়ার জন্য মিত্র দেশগুলির কাছে ফের আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ, ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা এখন নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। একদিকে রুশ হামলায় উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ, অন্যদিকে সম্ভাব্য কয়েক দশক হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েনের দাবি—দুইয়ের জেরে সংঘাত আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি।



