অর্ক সানা, সম্পাদক (নজরবন্দি): একটা আলো দেখা যাচ্ছে। হয়তো খুব ক্ষীণ, কিন্তু অন্ধকারে একটা রাস্তা দেখাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের ঐতিহাসিক রায় ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি রক্ষা করল। আর সেই রায়ই এখন নতুন প্রশ্ন ও আশার জন্ম দিয়েছে স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) সেই ১৮,৪৪২ জন শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীর জন্য, যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের যোগ্য (Eligible) দাবি করে আসছেন।
গত ৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট ২০১৬ সালের এসএসসি স্কুল নিয়োগ এর পুরো প্যানেল বাতিল করে। সংখ্যাটি ছিল ২৫,৭৩৫। শীর্ষ আদালতের যুক্তি ছিল, অযোগ্য (Ineligible) ও যোগ্য প্রার্থীদের আলাদা করা সম্ভব নয়। তাই পুরো প্যানেল বাতিল করার সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেই দিন থেকেই একটি প্রশ্ন জ্বলছিল: সবাই কি সত্যিই অযোগ্য?
হাইকোর্টের বিচারপতি অমৃতা সিনহার সাম্প্রতিক তাগাদায় ধাপে ধাপে উত্তর মিলতে শুরু করেছে। প্রথমে ১,৮০৬ জন অযোগ্য বা দাগি (Tainted) শিক্ষকের তালিকা প্রকাশ করেছে এসএসসি। তারপর গ্রুপ সি ও ডি-র ক্ষেত্রে ৩,৫১২ জনের তালিকা আসে। কিন্তু আদালতকে এসএসসি আগে জানিয়েছিল, মোট অযোগ্যদের সংখ্যা ৭,২৯৩।
বেঁচে যাবে SSC-র ১৮ হাজার যোগ্য শিক্ষকের চাকরি? হাইকোর্টের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
এই সপ্তাহেই বিচারপতি অমৃতা সিনহা ৭,২৯৩ জনের সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। এই সংখ্যাগুলি বিশ্লেষণ করলে চমকপ্রদ এক গাণিতিক সত্য উঠে আসে। মোট চাকরিচ্যুত ২৫,৭৩৫ জনের মধ্যে যদি ৭,২৯৩ জনই প্রমাণিত অযোগ্য হন, তাহলে বাকি ১৮,৪৪২ জন স্বাভাবিকভাবেই দাগহীন বা যোগ্য প্রার্থী হিসেবে থেকে যাচ্ছেন।

এখানেই আজকের প্রাথমিক শিক্ষক মামলার রায় একটি শক্তিশালী নজির (Strong Precedent) হয়ে দাঁড়ায়। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী ও ঋতব্রতকুমার মিত্রের বেঞ্চ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি (Humanitarian Grounds) তুলে ধরে বলেছেন, দীর্ঘ নয় বছর চাকরি করার পর একটি পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ (Financial Future) ধ্বংস করা যায় না। এই যুক্তি কি এসএসসি-র যোগ্য শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়?
নিঃসন্দেহে, দুর্নীতির মামলা (Corruption Case) এবং তদন্ত সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কিন্তু আদালত যখনই দাগি ও দাগহীন প্রার্থীদের আলাদা করার চেষ্টা করছেন, তখনই সেই ১৮,৪৪২ জনের ভাগ্য নিয়ে বড় রকমের প্রশ্ন তৈরি হয়। হাইকোর্ট কি এই নজির ব্যবহার করে সুপ্রিম কোর্টের দরবারে যোগ্যদের পক্ষে কোনও সুপারিশ করতে পারেন?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে, নতুন এসএসসি পরীক্ষা (New SSC Exam) এর কী হবে? সহজ গণিত বলে, ৭,২৯৩টি শূন্যপদ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে। নতুন পরীক্ষার মাধ্যমে সেগুলি পূরণ করা যেতে পারে। কিন্তু ১৮,৪৪২ জনের পক্ষে যুক্তি দেওয়া যায়, তারা ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং দাগি হিসাবে প্রমাণিত হননি। তাহলে কি তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে?
এটি একটি জটিল আইনি ধাঁধা (Complex Legal Puzzle)। একদিকে রয়েছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান (Clean-up Drive) এর অপরিহার্যতা। অন্যদিকে রয়েছে হাজার হাজার সম্ভবত নির্দোষ পরিবারের জীবন-মরণ সংকট। প্রাথমিক শিক্ষক মামলার রায় দেখিয়েছে, আদালত মানবিক প্যারামিটারকেও গুরুত্ব দিতে পারে।
বিচারপতি অমৃতা সিনহার বেঞ্চে যখন চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হবে, তখনই বোঝা যাবে ১৮,৪৪২ সংখ্যাটি কতটা শক্ত ভিত্তি পায়। তারপর হয়তো হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এই রায়কে নজির (Case Precedent) হিসাবে উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টে একটি সুপারিশ (Recommendation) পাঠাতে পারে। এটি একটি দীর্ঘ পথ, কিন্তু আজকের রায়ে অসম্ভব কথাটি একটু মলিন হয়েছে।
আমি আইনজ্ঞ নই, একজন সাংবাদিক। কিন্তু সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো সম্ভাবনার দিকে ইশারা করা। আজ ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক আশার আলো দেখলেন। আগামীকাল কি সেই আলোয় উজ্জ্বল হবেন এসএসসি-র ১৮,৪৪২ জন শিক্ষক-কর্মী? সময়ই উত্তর দেবে। কিন্তু প্রতিটি রায় যে শুধু একটি মামলারই finale নয়, বরং অন্য অনেকের হোপ (Hope) হয়ে ওঠে, তা আবারও প্রমাণ করল কলকাতা হাইকোর্ট।



