হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের ঐতিহাসিক রায়ে প্রশিক্ষণহীন ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বহাল, তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের তদন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিচারপতিরা।
এক দীর্ঘ আইনি অশান্তির পর অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন পশ্চিমবঙ্গের ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক। কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সিঙ্গল বেঞ্চের নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে, যা এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের বেঞ্চ এই মর্মে রায় দেন যে, শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে, কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলায় দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলবে।
এই রায়ের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ২০১৪ থেকে শুরু হওয়া এক অনিশ্চয়তার অধ্যায় সাময়িকভাবে ইতি টানল। গত বছর মে মাসে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের রায়ে প্রশিক্ষণহীন (Untrained) এই শিক্ষকদের চাকরি বাতিল করে তাদের পার্শ্বশিক্ষক (Para Teacher) হিসেবে রাখার এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন পুনর্নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই রায়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন হাজার হাজার শিক্ষক ও তাদের পরিবার। ডিভিশন বেঞ্চের আজকের এই রায়ে সেই আতঙ্ক কাটল।
২০১৪ সালের টেট (TET) ভিত্তিক এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ৪২ হাজার ৫০০-রও বেশি শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। কিন্তু নিয়োগে বিপুল অনিয়ম (Large Scale Irregularities) ও দুর্নীতির (Corruption) অভিযোগ ওঠে মামলাকারীদের তরফ থেকে। অভিযোগগুলির মধ্যে ছিল সংরক্ষণ বিধি (Reservation Policy) লঙ্ঘন, সিলেকশন কমিটি (Selection Committee) গঠন না করা, অ্যাপটিটিউড টেস্ট (Aptitude Test) না নেওয়া এবং যোগ্যতাহীন প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার মতো গুরুতর ইস্যু।
৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি বেঁচে গেল, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের রায় খারিজ ডিভিশন বেঞ্চে
রাজ্য সরকার ও প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ (Primary Education Board) এইসব অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে দাবি জানায় যে, দুর্নীতির কোনও কংক্রিট প্রমাণ নেই এবং প্রক্রিয়াগত কিছু ত্রুটি সংশোধন করা হয়েছে। রাজ্যের এই যুক্তিই ডিভিশন বেঞ্চে বেশি জোর পেয়েছে বলে আইন বিশেষজ্ঞদের অনুমান। বেঞ্চের মূল যুক্তি মনে করা হচ্ছে, দীর্ঘ নয় বছর চাকরি করার পর যদি এই শিক্ষকদের চাকরি চলে যায়, তাহলে তাদের পরিবারগুলির ভবিষ্যৎ আর্থিক সংকটে পড়বে, যা একটি বৃহত্তর মানবিক সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ, ‘‘এত দিন চাকরি করেছেন ৩২ হাজার শিক্ষক। তাঁদের পরিবারের কথা ভেবে আদালত চাকরি বাতিল করছে না। দুর্নীতি হয়েছে। কিন্তু এতগুলো পরিবারের দিকে তাকিয়ে চাকরি বাতিলের সিদ্ধান্ত খারিজ করা হল।”

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেই দিচ্ছেন, চাকরি বহাল রাখার এই রায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার ত্রুটিগুলিকে মুছে দেয়নি। আদালত দুর্নীতির মামলা চলমান রাখার যে কথা বলেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হল, সিবিআই তদন্ত (CBI Investigation) বা অন্য কোনো তদন্তকারী সংস্থার কাজ, যদি চলমান থাকে, তা অব্যাহত থাকবে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ মামলা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
এই রায়ের প্রভাব কেবল ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষকের ওপরই নয়, পুরো রাজ্যের শিক্ষা প্রশাসনের ওপরও পড়বে। একটি স্থিতিশীলতা (Stability) ফিরলেও, ২০১৬ সালের এসএসসি স্কুল নিয়োগ মামলা এবং এই প্রাথমিক নিয়োগ মামলা মিলিয়ে রাজ্যের শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর জনসাধারণের আস্থা ভাঙনের প্রশ্নটি রয়েই গেল। স্বচ্ছ নিয়োগ (Transparent Recruitment) এর দাবি আজ আরও জোরালো।
ভবিষ্যতে কী হবে? ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে শিক্ষকদের চাকরি সুরক্ষিত হলেও, প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদকে আরও জবাবদিহি (Accountability) এর মধ্যে আসতে হবে। নিয়োগের গাইডলাইন কঠোরভাবে মেনে চলা এবং যেকোনো ভবিষ্যতের নিয়োগ (Future Recruitment) শতভাগ স্বচ্ছভাবে সম্পাদনের উপরই এখন জোর দেওয়া হচ্ছে। আজকের এই রায় হাইকোর্টের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন, যা একদিকে মানবিক সংবেদনশীলতা এবং অন্যদিকে কর্মপদ্ধতির ত্রুটি—দুটোরই খেয়াল রেখেছে।



