NEET প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে ছাত্র আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল আলোচনা। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের (Dharmendra Pradhan) পদত্যাগের দাবিতে অনশন করে আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলেছিলেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক (Sonam Wangchuk)। কিন্তু মন্ত্রীর পদত্যাগের আগেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডার (J. P. Nadda) হাত থেকে স্যুপ খেয়ে অনশন ভাঙায় উঠেছিল ‘সরকারের সঙ্গে আপস’-এর প্রশ্ন। এবার সেই জল্পনারই জবাব দিলেন সোনম। তাঁর দাবি, কোনও সমঝোতার কারণে নয়, সম্ভাব্য হিংসা ও রক্তপাত এড়াতেই তিনি অনশন থেকে সরে এসেছিলেন।
সম্প্রতি ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সোনম জানান, আন্দোলনকারীদের সংসদ অভিযানকে কেন্দ্র করে দিল্লির পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছিল। সমাজমাধ্যমে আন্দোলনকারীদের হুমকি, একাধিক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া এবং বাইরে থেকে অতিরিক্ত বাহিনী আনার খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছিল বলে তাঁর দাবি।
এই পরিস্থিতি তাঁকে আগের একটি ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। সোনমের কথায়, গত বছর সেপ্টেম্বরে লেহ্-তে ঘটে যাওয়া হিংসাত্মক ঘটনার স্মৃতি তাঁর মনে ফিরে আসে। তাঁর আশঙ্কা হয়েছিল, দিল্লিতেও পরিস্থিতি বড় ধরনের রক্তপাতের দিকে যেতে পারে। সেই কারণেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে সাময়িক ভাবে পিছনে রেখে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
অর্থাৎ অনশন ভাঙার পিছনে রাজনৈতিক সমঝোতা নয়, আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তাই তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল বলে দাবি সোনমের। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল তরুণ প্রজন্মের দাবি সামনে আনা। ব্যক্তিগত ভাবে আন্দোলনের সাফল্যের কৃতিত্ব নেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।
সোনম জানান, অনশন আরও কয়েক দিন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আরও তিন-চার দিন অনশন করলে আন্দোলনের সাফল্যের মুখ হিসেবে তাঁকেই সামনে আনা হত বলেও অনেকে তাঁকে বলেছিলেন। কিন্তু সেই পথে হাঁটেননি তিনি। তাঁর মতে, এই লড়াই কোনও একজন ব্যক্তির নয়, দেশের তরুণ প্রজন্মের।
অনশন ভাঙার নেপথ্যে কোনও কংগ্রেস সাংসদের মধ্যস্থতার গুঞ্জনও সেই সময় ছড়িয়েছিল। সেই দাবিও খারিজ করেছেন সোনম। তাঁর বক্তব্য, আন্দোলনের পরিস্থিতি দেখে সরকার যখন আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করে, তখন গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (Intelligence Bureau)-এর আধিকারিকেরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
এরপর পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সোনমের দাবি, হাসপাতালে তাঁকে দেখতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা এবং জিতেন্দ্র সিং (Jitendra Singh)। তাঁদের কাছে তিনি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর অগ্রাধিকার হল আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রথমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা মৌখিক আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে জানান সোনম। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, লিখিত আশ্বাস না পাওয়া পর্যন্ত অনশন প্রত্যাহার করতে রাজি ছিলেন না। পরে লিখিত আশ্বাস পাওয়ার পরই অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
তবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর হাত থেকে স্যুপ খেয়ে অনশন ভাঙার দৃশ্য নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এর মাধ্যমে কি আন্দোলনের সঙ্গে সরকারের আপসের বার্তা গিয়েছে? সেই সমালোচনারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন সোনম।
তাঁর দাবি, লাদাখের আন্দোলনের একটি নিজস্ব প্রথা রয়েছে। দাবি মেনে নেওয়ার পরে সরকারি আধিকারিকদের হাতে স্যুপ বা ফলের রস খেয়ে অনশন ভাঙাকে সেখানে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে দাবি পূরণ না হলে সাধারণ নাগরিক বা শিশুর হাতে অনশন ভাঙার রীতি রয়েছে বলে জানান তিনি।
নিজের পরিবারের একটি পুরনো ঘটনার কথাও তুলে ধরেছেন সোনম। তাঁর বাবা সোনাম ওয়াংয়ালের অনশন একসময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভাঙিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। সেই প্রেক্ষাপটেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের হাতে স্যুপ খেয়ে অনশন ভাঙাকে লাদাখের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন সোনম।
ফলে NEET আন্দোলনের মাঝপথে তাঁর অনশন ভাঙা নিয়ে যে ‘সরকারের সঙ্গে আপস’-এর জল্পনা তৈরি হয়েছিল, তা সরাসরি নাকচ করলেন সোনম ওয়াংচুক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জয় নয়, আন্দোলনকারী তরুণদের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর আন্দোলনকে হিংসার হাত থেকে বাঁচানোই ছিল সেই মুহূর্তে তাঁর প্রধান লক্ষ্য।



