১২ আগস্ট সূর্যগ্রহণে শুধু অন্ধকার নয়, দেখা যাবে ১৩টি বিরল দৃশ্য! ভুল করেও মিস করবেন না

১২ আগস্ট ২০২৬-এর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণে সূর্যের করোনা থেকে শুরু করে Baily’s Beads, ছায়ার ঢেউ, ৩৬০ ডিগ্রি সূর্যাস্ত, উল্কা—চোখের সামনে বদলে যাবে আকাশ।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

নজরবন্দি ব্যুরো: ১২ আগস্ট ২০২৬-এর পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ নিয়ে এখন থেকেই তৈরি হচ্ছে মহাজাগতিক উত্তেজনা। কিন্তু চাঁদ সূর্যকে ঢেকে দিয়ে দিনের আকাশ অন্ধকার করে দেবে—ঘটনাটি শুধু এতটুকু নয়। পূর্ণগ্রাসের আগে, চলাকালীন এবং পরে আকাশে একের পর এক দেখা যেতে পারে ১৩টি অসাধারণ দৃশ্য। সূর্যের করোনা অবশ্যই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, কিন্তু সানস্পট, গ্রহ, ছায়ার ঢেউ, ‘ডায়মন্ড রিং’, Baily’s Beads, লাল প্রমিনেন্স থেকে শুরু করে উল্কা ও সম্ভাব্য অরোরা—তালিকাটি বেশ চমকপ্রদ।

এই পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সম্পূর্ণতা বা Totality দেখা যাবে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, উত্তর রাশিয়া, আটলান্টিক মহাসাগর, স্পেন এবং পর্তুগালের একটি ছোট অংশ থেকে। উত্তর গোলার্ধের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখা যাবে আংশিক সূর্যগ্রহণ।

তবে গ্রহণ দেখতে গেলে প্রথমেই একটি কথা মনে রাখতে হবে—আংশিক গ্রহণের সময় খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো যাবে না। ISO 12312-2 মানসম্মত eclipse glasses বা উপযুক্ত solar viewer ব্যবহার করতে হবে। ক্যামেরা, দূরবীন বা টেলিস্কোপ দিয়েও সরাসরি সূর্য দেখতে হলে আলাদা solar filter প্রয়োজন।

১. সূর্যের গায়ে দেখা যাবে কালো কালো সানস্পট

পূর্ণগ্রাসের আগের আংশিক পর্যায় থেকেই শুরু হতে পারে প্রথম আকর্ষণ। নিরাপদ solar glasses দিয়ে সূর্যের দিকে তাকালে চাঁদের কালো প্রান্তের সামনে কয়েকটি কালো দাগ দেখা যেতে পারে। এগুলিই Sunspots বা সৌরকলঙ্ক—সূর্যের তুলনামূলক ঠান্ডা অঞ্চল, যেখানে শক্তিশালী ও জটিল চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়। সৌরঝড় ও solar flare-এর সঙ্গে এই অঞ্চলগুলির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

২. দিনের আকাশে হঠাৎ দেখা দিতে পারে বৃহস্পতি, শুক্র, বুধ

পূর্ণগ্রাসের প্রায় ১৫ মিনিট আগে আকাশের দিকে নজর রাখলে গ্রহও চোখে পড়তে পারে। ১২ আগস্টের গ্রহণের সময় বৃহস্পতি সূর্যের পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রায় ১১ ডিগ্রি দূরে অবস্থান করবে। তার আরও কিছুটা দূরে থাকবে বুধ। শুক্র থাকবে সূর্যের পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অনেকটা দূরে, আর মঙ্গল পশ্চিম আকাশে নিচু অবস্থানে থাকায় তুলনামূলক কঠিন হবে দেখা।

৩. মাটিতে ফুটে উঠবে অসংখ্য অর্ধচন্দ্রাকৃতি ছায়া

গ্রহণের সময় শুধু আকাশের দিকে তাকানোর দরকার নেই। সূর্যের ৫০ শতাংশের বেশি অংশ ঢাকা পড়লে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আসা আলো মাটিতে ছোট ছোট crescent-shaped shadow তৈরি করতে পারে। ছোট ছিদ্রযুক্ত কোনও বস্তু দিয়েও এই অর্ধচন্দ্রাকৃতি আলোর ছবি মাটিতে ফেলা যায়।

৪. সাদা মাটিতে ছুটতে পারে ‘ছায়ার সাপ’

পূর্ণগ্রাসের প্রায় দুই মিনিট আগে এবং পরে বিশেষ পরিস্থিতিতে সাদা বা হালকা রঙের পৃষ্ঠে ঢেউ খেলানো সরু ছায়া দেখা যেতে পারে। এগুলিকে Shadow Bands বা ‘shadow snakes’ বলা হয়। স্পেনে গ্রহণটি আকাশের তুলনায় নিচু অবস্থানে থাকায় এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয়।

৫. কয়েক মুহূর্তেই কমে যাবে আলো ও তাপমাত্রা

সূর্যের প্রায় ৮০ শতাংশ ঢাকা পড়ার পর থেকেই পরিবেশে পরিবর্তন টের পাওয়া যেতে পারে। আলো দ্রুত কমবে, চারপাশ ঠান্ডা হতে শুরু করবে এবং পূর্ণগ্রাসের ঠিক আগে দিনের স্বাভাবিক আলো এক অদ্ভুত রূপ নেবে। এই কয়েক মিনিটের পরিবর্তনই অনেকের কাছে গ্রহণের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।

৬. চোখের সামনে ছুটে যাবে চাঁদের ছায়া

পূর্ণগ্রাসের আগে পৃথিবীর উপর দিয়ে এগিয়ে আসবে চাঁদের Umbra, অর্থাৎ সেই ছায়ার অংশ যেখানে সূর্য পুরোপুরি ঢাকা পড়ে। Space.com-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড ও আইসল্যান্ডের উপর এই ছায়া ঘণ্টায় প্রায় ২,২০০ মাইল বেগে এগোতে পারে, আর পূর্ব স্পেনে গতি প্রায় ১২,০০০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

৭. চোখের সামনে তৈরি হবে ‘ডায়মন্ড রিং’ ও Baily’s Beads

পূর্ণগ্রাসের ঠিক আগে সূর্যের শেষ আলো চাঁদের পাহাড়-উপত্যকার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে ছোট ছোট আলোর বিন্দু তৈরি করে। এগুলিই Baily’s Beads। শেষ আলোকবিন্দুটি মিলিয়ে যাওয়ার ঠিক মুহূর্তে তৈরি হয় বিখ্যাত Diamond Ring Effect। পূর্ণগ্রাস শেষ হওয়ার সময় বিপরীত ক্রমে আবার এই দৃশ্য দেখা যায়।

৮. কয়েক মিনিটের জন্য খুলে যাবে সূর্যের গোপন করোনা

সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই Solar Corona বা সৌর করোনা। চাঁদ যখন সূর্যের উজ্জ্বল ফোটোস্ফিয়ার পুরোপুরি ঢেকে দেয়, তখন তার বাইরের অত্যন্ত উত্তপ্ত আবহমণ্ডলটি দৃশ্যমান হয়। সাদা, সূক্ষ্ম এবং দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা করোনার রেখাগুলি খালি চোখে দেখা যায় শুধুমাত্র পূর্ণগ্রাসের সময়।

এখানে নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে। শুধু পূর্ণগ্রাসের সেই সংক্ষিপ্ত সময়েই, যখন সূর্যের উজ্জ্বল অংশ সম্পূর্ণভাবে চাঁদের আড়ালে, তখন সরাসরি দেখা নিরাপদ। সূর্যের সামান্য অংশও ফিরে এলে সঙ্গে সঙ্গে eclipse glasses পরে নিতে হবে।

৯. দেখা যেতে পারে সূর্যের লাল ক্রোমোস্ফিয়ার

পূর্ণগ্রাস শুরু ও শেষ হওয়ার ঠিক আশপাশে কয়েক মুহূর্তের জন্য সূর্যের প্রান্তে একটি সরু লালচে রেখা দেখা যেতে পারে। সেটিই Chromosphere, সূর্যের বায়ুমণ্ডলের একটি স্তর। বিজ্ঞানীদের কাছে এই ক্ষণস্থায়ী দৃশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আলো বিশ্লেষণ করে সূর্যের বায়ুমণ্ডলে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।

১০. চাঁদের চারপাশে ফুটে উঠতে পারে গোলাপি প্রমিনেন্স

পূর্ণগ্রাসের সময় চাঁদের কালো চাকতির চারপাশে গোলাপি বা লালচে উজ্জ্বল রেখা, স্পাইক কিংবা লুপ দেখা যেতে পারে। এগুলি Solar Prominences—সূর্যের ক্রোমোস্ফিয়ার থেকে করোনা পর্যন্ত প্রসারিত প্লাজমার কাঠামো, যা অনেক সময় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়।

তবে এখানে একটি সংশোধন জরুরি। মূল প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের গ্রহণকে সৌর সর্বোচ্চের খুব কাছাকাছি বলা হলেও NASA ও NOAA-র তথ্য অনুযায়ী Solar Cycle 25-এর সর্বোচ্চ পর্যায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে পেরিয়ে গিয়েছে। তাই ২০২৬ সালে সূর্য এখনও সক্রিয় থাকলেও এটি আর solar maximum-এর সময় নয়।

১১. চারদিকে তৈরি হবে ৩৬০ ডিগ্রি সূর্যাস্তের মতো আকাশ

পূর্ণগ্রাসের সময় শুধু মাথার উপর নয়, চারপাশের দিগন্তের দিকেও তাকানো যেতে পারে। সূর্যের আলো হঠাৎ কমে যাওয়ায় দিগন্তের বিভিন্ন দিকে কমলা, লালচে ও নীলচে আলোর স্তর তৈরি হয়ে এক ধরনের ৩৬০ ডিগ্রি সূর্যাস্তের অনুভূতি দিতে পারে। মেঘ থাকলেও এই আকাশের রঙ আলাদা অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

১২. গ্রহণের কয়েক ঘণ্টা পরই আকাশে শুরু হবে Perseid Meteor Shower-এর চূড়া

এবারের গ্রহণের সঙ্গে রয়েছে আরও একটি মহাজাগতিক কাকতালীয় ঘটনা। ১২-১৩ আগস্ট Perseid Meteor Shower-এর peak-এর সময়। অর্থাৎ পূর্ণগ্রাসের কয়েক ঘণ্টা পর রাতের আকাশে উল্কাবৃষ্টির অন্যতম সেরা দৃশ্য দেখা যেতে পারে। NASA-র তথ্য অনুযায়ী, অন্ধকার আকাশে Perseids সাধারণত প্রতি ঘণ্টায় কয়েক ডজন উল্কা দেখার সুযোগ দিতে পারে।

গ্রহণের পূর্ণগ্রাস চলাকালীন উল্কা দেখা সম্ভব হলেও সেটি অত্যন্ত দুর্লভ সম্ভাবনা। কারণ তখন সূর্যের করোনা থেকে চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকানোই কঠিন হবে।

১৩. আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডে অরোরার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না

সবশেষে রয়েছে সবচেয়ে অনিশ্চিত দৃশ্য—Aurora Borealis বা মেরুজ্যোতি। পূর্ণগ্রাসের সময় আইসল্যান্ড বা গ্রিনল্যান্ডের আকাশে অরোরা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। দিনের আলোয় অরোরা সাধারণত দুর্বল থাকে। বরং গ্রহণের রাতে, বিশেষ করে আইসল্যান্ডে, অরোরা দেখার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

১২ আগস্টের পূর্ণগ্রাস তাই শুধুমাত্র “দিনের বেলা রাত নেমে আসা” নয়। চাঁদের ছায়া এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সানস্পট, গ্রহ, অদ্ভুত ছায়া, দ্রুত কমে যাওয়া আলো, Baily’s Beads, Diamond Ring, করোনা, ক্রোমোস্ফিয়ার ও প্রমিনেন্স—একটির পর একটি দৃশ্য বদলে দিতে পারে আকাশের চেহারা। আর গ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই Perseid-এর উল্কাবৃষ্টি অপেক্ষা করবে রাতের আকাশে। NASA-ও এই গ্রহণকে সূর্যের করোনা ও পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল নিয়ে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, এই মহাজাগতিক দৃশ্য উপভোগ করতে গিয়ে চোখের নিরাপত্তা যেন কোনওভাবেই উপেক্ষা না হয়। আংশিক পর্যায়ে অবশ্যই অনুমোদিত solar viewing glasses ব্যবহার করতে হবে এবং পূর্ণগ্রাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আবার চোখের সুরক্ষা ফিরিয়ে নিতে হবে। ১২ আগস্টের সূর্যগ্রহণে আকাশ শুধু অন্ধকার হবে না—পর্যবেক্ষকের সামনে একের পর এক খুলে যেতে পারে মহাবিশ্বের ১৩টি চমকপ্রদ দৃশ্য।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন