শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সমীকরণে ফের নতুন করে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ৫ অগস্ট নয়াদিল্লি থেকে প্রাক্তন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল ভাষণ এবং দেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে আয়োজিত BRICS Summit-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (Tarique Rahman) যোগদান নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। তবে সফর বাতিল হয়েছে, এমন কোনও সরকারি ঘোষণা এখনও নেই। বরং ভারতের বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর (Dinesh Trivedi) মন্তব্যে দুই রাষ্ট্রনেতার মুখোমুখি বৈঠকের সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।
বাংলাদেশকে BRICS-এর সদস্য না হলেও বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মেলনের outreach session-এ আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। ২৩ জুলাই বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছিল, নয়াদিল্লির পাঠানো আমন্ত্রণপত্র প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ তারেক রহমানের ভারত সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও ঢাকার হাতেই রয়েছে।
তার মধ্যেই ৫ অগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে থাকা হাসিনা ওই অনুষ্ঠানে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। বাংলাদেশ সরকার তাঁর বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে।
এই আবহেই দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের বাংলাদেশে নিযুক্ত হাইকমিশনারের বক্তব্য, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি আলোচনা হলে অনেক সমস্যার সমাধানের পথ খুলতে পারে। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমেই দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান সম্ভব এবং এই ধরনের বৈঠকের মধ্যে নেতিবাচক কিছু নেই।
ত্রিবেদীর এই মন্তব্যকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠছে, BRICS Summit-কে কি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মেরামতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে নয়াদিল্লি? কারণ তারেক রহমান দিল্লিতে এলে নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সঙ্গে তাঁর সরাসরি বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একাধিক বিষয় নিয়েও সেই বৈঠকে আলোচনা হতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।
তবে শেখ হাসিনার বিষয়টি যে দুই দেশের সম্পর্কে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে, তা স্পষ্ট। ৫ অগস্টের অনুষ্ঠানের আগে ভারত সরকার জানিয়ে দিয়েছিল, ওই বেসরকারি উদ্যোগে তাদের কোনও ভূমিকা নেই এবং অনুষ্ঠানে হাসিনা যে বক্তব্য দেবেন, তার সঙ্গে নয়াদিল্লির কোনও যোগ নেই।
হাসিনার ভারত-অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের অস্বস্তি নতুন নয়। তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়েও ঢাকা বারবার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, ভারত এখনও সেই অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর অধ্যায় তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে নয়াদিল্লি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক যে জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকে নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সেই কারণেই BRICS Summit-এর আমন্ত্রণকে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আমন্ত্রণ হিসেবে দেখছেন না কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। বাংলাদেশ বর্তমানে BRICS-এর সদস্য নয়। তবে BIMSTEC-এর বর্তমান চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে outreach session-এ আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই মঞ্চ দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
এখন মূল প্রশ্ন, তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত দিল্লি আসবেন কি না। এখনও পর্যন্ত তাঁর সফর বাতিলের কোনও সরকারি ঘোষণা হয়নি। বরং বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, আমন্ত্রণটি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই নেবেন।
ফলে হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন কূটনৈতিক অস্বস্তি তারেকের ভারত সফরের পথে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটাই এখন দেখার। তবে দীনেশ ত্রিবেদীর ‘দুই প্রধানমন্ত্রীর মুখোমুখি আলোচনা’র বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে—নয়াদিল্লি অন্তত এই মুহূর্তে সরাসরি রাজনৈতিক সংলাপের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান দিল্লিতে এলে সেই বৈঠকই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে।



