নন্দীগ্রামে ইন্দ্রপতন অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু জিতবে কে? কিভাবে? #Editorial

নন্দীগ্রামে ইন্দ্রপতন অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু জিতবে কে? কিভাবে? #Editorial
নন্দীগ্রামে ইন্দ্রপতন অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু জিতবে কে? কিভাবে? #Editorial

অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি): নন্দীগ্রামে ইন্দ্রপতন অবশ্যম্ভাবী! যেই হারুন না কেন বাংলার রাজনীতিতে ঘটবে ইন্দ্রপতণ। কিন্তু জিতবে কে? সঠিক অর্থে জানা যাবে ২রা মে। কিন্তু এই একমাস যে কাটতে চাইছেনা বাংলার রাজনীতিপ্রিয় মানুষজনের কাছে। তাই ব্যাক্তিগত ভাবে এই প্রতিবেদন লেখার চেষ্টা করছি। যেদিন ভোট গ্রহণ হল তাঁর দুদিন আগে টিম নজরবন্দি পৌঁছে গিয়েছিল নন্দীগ্রামে। একাধিক নাকা চেকিং পেরিয়ে যখন নন্দীগ্রামে গাড়ি ঢুকল দেখে মনে হল যুদ্ধক্ষেত্রে পা দিয়েছি আমরা।

নন্দীগ্রামের রাজপথে হাতে গোনা কিছু অটো, টোটো আর বাস বাদ দিয়ে যা দেখা যাচ্ছিল তা সংবাদমাধ্যম আর নির্বাচন কমিশন তথা পুলিশের গাড়ি। প্রাথমিক ভাবে বা আপাত চোখে দেখে যা বুঝলাম কমবেশি সব সংবাদমাধ্যমের গাড়ি ফলো করছে হেভিওয়েট দুই নেতা নেত্রীর কার্যকলাপ কে। কিন্তু যারা ভোট দেবেন অর্থাৎ জনগনের কাছে গেছেন কি কেউ। ভাবা মাত্রই কাজ। বেরিয়ে পড়লাম আমরা। রাজপথ ছাড়িয়ে ঢালাই রাস্তায় কখনও বা আলপথ ধরে। অদ্ভুত ভাবে নীরব জনগন স্তব্ধতা যেন শ্মশানের।

পতাকাযুদ্ধ নজরে পড়ল নন্দীগ্রাম জুড়ে। সেই পতাকাই জানান দিচ্ছিল কোন দলের প্রভাব কোন এলাকায় রয়েছে। একটা জিনিশ লক্ষ করলাম। বিজেপির পতাকার থেকে বেশি উড়ছে হিন্দুত্ব প্রদর্শনকারী ধ্বজা। অর্থাৎ ৩ কোনা গেরুয়া পতাকা, তাতে লেখা রয়েছে ওঁ! শুভেন্দু বাবুর রাজনীতিটা পরিষ্কার বোঝা গেল। যদি বিজেপির পতাকা লাগানো হয় তাহলে তা বিরোধী পক্ষ ছিঁড়ে ফেলেদিতে পারে। তাই হিন্দুত্বের পতাকা লাগাও। পতাকা ছিঁড়ে দিলেই কেল্লা ফতে! সোজা হিন্দু-মুসলমানে বিভাজন!

আরও পড়ুনঃ চিড় ধরল সংযুক্ত মোর্চার ঐক্যে, কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ আব্বাসের!

বেশ কিছু গ্রামে গিয়ে বুঝলাম শুভেন্দু অধিকারী হিন্দু মুসলমান ভাগাভাগিতে আপাত সফল। যদিও গ্রামবাসীদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপনে সফল হয়েছে বিজেপি কিন্তু হিন্দু মুসলিম ইস্যুতে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যাওয়া গ্রামবাসীরাই জানালেন ভোট শেষ হয়ে গেলে তো সব মিলিটারি চলে যাবে তখন কি হবে? তাই ক্যামেরার সামনে স্পিকটি নট। সিপিআইএম প্রার্থী এসেছিলেন? হাতে গোনা কয়েকটি এলাকা বাদদিয়ে প্রায় সব এলাকার মানুষই জানালেন ‘হ্যাঁ’! অনেকেই প্রশংসা করলেন… ‘প্রার্থী খুব ভাল।’ ভোট দেবেন তো? উত্তর এল, ‘আগে সবাই সিপিএম করত এখানে। কিন্তু এখন সব বিজেপি।’ ততক্ষনে এলাকার দাদারা ভিড় বাড়াচ্ছেন আমাদের ঘিরে। বেগতিক দেখে চলে গেলাম উন্নয়নের প্রশ্নে। সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন উন্নয়ন হয়েছে, আমফানের টাকা, রেশনের ফ্রি চাল সবই পেয়েছেন। আক্ষেপ শুধু চাকরি না পাওয়া নিয়ে।

প্রায় ১০ টি হিন্দু এলাকায় ঘুরে বুঝলাম অন্তত ৭০-৭৫ শতাংশ হিন্দু ভোট সোজা পড়বে বিজেপিতে, এখানে আর কোন ইস্যু নেই। মুসলমান এলাকায় গিয়ে বুঝলাম ১০০% মুসলমান ভোট পড়বে তৃণমূলে। সিপিএম? প্রায় সবাই জানালেন মীনাক্ষী ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছে কিন্তু তাঁকে ভোট দেওয়া মানে ভোট নষ্ট করা! ভোটের আগের দিন দুপুরে সোজা পৌঁছে গেলাম শুভেন্দু অধিকারীর কাছে। চূড়ান্ত ব্যাস্ত, মিনিট ৫-৬ কথা হল। যা বুঝলাম মুখে কিছু না বললেও চূড়ান্ত চাপে রয়েছেন। বলা বাহুল্য দুপুরে গিয়েছিলাম তাই লাঞ্চ খাইয়ে তবেই ছাড়লেন বিজেপি অফিসের নেতা কর্মীরা। শুভেন্দ সহায়তা কেন্দ্রের কর্মীরা জানিয়ে দিলেন, “দাদা ১০ হাজার ভোটে হলেও জিতবেন!” বললাম মাত্র ১০ হাজার কেন? প্রেস্টিজ ফাইট! ৫০ হাজারের কম হলে… কথা শেষ হয়নি অন্য এক নেতা এগিয়ে এসে বললেন, “ওর কথা ছাড়ুন আমরা ১ লাখ ভোটে জিতব!”

মীনাক্ষীর সাথে দেখা করতে গেলাম ভোটের আগেরদিন রাত ১০টায়। দেখলাম কমিশনে অভিযোগ লেখার ফরম্যাট তৈরির কাজ চলছে। প্রার্থী এবং ৪জন নিরাপত্তারক্ষী সহ সেখানে উপস্থিত মোট ১২ জন। যার মধ্যে নন্দীগ্রামের ১ জন, বাকিরা কলকাতা সহ অন্য এলাকার। জানতে চাইলাম ইলেকশন এজেন্ট কোথায়? উত্তর এল বাড়ি চলে গেছে……! মীনাক্ষী মুখার্জীর পাশে সর্বদা যাকে দেখা যাচ্ছিল এই কদিন, সেই তন্ময় হক জানালেন মানুষ ভোট দিতে পারলে আমরা ১ ভোটে হলেও জিতব। কিন্তু তন্ময় দা পার্টি অফিসে লোকাল কেউ নেই কেন? যে উত্তর টা পেলাম বন্ধুত্বের দাবীতে তা এখানে লেখা সম্ভব নয়। শুধু বলতে পারি… যতটা ফেসবুকে রয়েছে ততটা লরাইয়ের মাঠে নেই বাম!

এবার ভোটের দিন। সাত সকালেই বোমাবাজি, বিজেপি কর্মীর আত্মহত্যা! টিভি দেখে যেটা বোঝা যাচ্ছিল স্পট সেটা বলছিল না। চূড়ান্ত অতিরঞ্জিত করে কিভাবে খবর প্রদর্শন করতে হয়ে তাতে একে অপরকে পাল্লা দিচ্ছিল তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলো। ততক্ষণে খবর এসে গিয়েছে ৮০ টা বুথে এজেন্ট নেই তৃণমূলের। বসতে দেয়নি বাহিনী। আমি আর টাইমসের সুমন দা যখন এইসব আলোচনা করছি রেয়াপাড়ার একটি চা দোকানে তখন সেখানে উপস্থিত মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী ৪ জনের মধ্যে একজন। সোজা ফোন করে বসলেন ‘দিদি’কে খবর পাঠালেন। ব্যাস….! কিছুক্ষন পর আচমকাই ফোন বাজল, তৃণমূল এজেন্টের নাক ফাটিয়ে বুথ থেকে বার করে দিয়েছে বিজেপি সমর্থকরা। বুথে দেদার চলছে লুঠ। স্পট সেই মক্তব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ নং বুথ। কাউকে কিছু না জানিয়ে হট স্টোরির আশায় আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দবাজার ডিজিটাল, টাইমস অব ইন্ডিয়া আর নজরবন্দি পৌঁছাল স্পটে। গিয়ে দেখা গেল রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সেই তৃণমূল কর্মী। মুখে হাজার অভিযোগ। তাঁকে পাশ কাটিয়ে বুথের দিকে এগোলাম। পথে পড়ল বিজেপির ক্যাম্প। জনা চারেক বসে রয়েছেন। খোশগল্প চলছে। বললাম,। তৃণমূলের এজেন্ট বসতে দেননি আপনারা? উত্তর এল সিপিএমের তো এজেন্ট দিয়েছি। মানে? গেরুয়া টিকা পরা নেতারা জানিয়ে দিলেন মমতা জিতলেই হিন্দুদের বিপদ। আগে আমরা সব সিপিএম করতাম এখন হিন্দুদের বাঁচাতে বিজেপি করছি!

এবার গন্তব্য বুথ, গিয়ে দেখলাম বুথের ৩০ মিটারের মধ্যে খোশ গল্পে মজেছেন বিজেপি কর্মীরা। কারো গলায় আবার গেরুয়া উত্তরীয়। জিজ্ঞাসা করলাম, দাদা ১০০ মিটারের মধ্যে থাকার তো নিয়ম নেই? উত্তর এল। নিজেদের এলাকায় নিজেরা থাকব ক্ষতি কি? হিন্দিভাষী কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান রা বুথে ঢুকতে বাঁধা দিলেন আমাদের। তবুও ঢুকলাম। দেখলাম মাছি তাড়াচ্ছেন প্রিসাইডিং অফিসার। বললাম ১০০ মিটারের মধ্যে দল্বল নিয়ে বসে রয়েছে বিজেপি কর্মীরা সরাবেন না? উত্তর এল, কি দরকার? প্রাণ নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই তো হল! আধাসেনাদের সাথে কথা বলে বুঝলাম “কমল ছাপ” ছাড়া তাঁরা আর কিছুই চেনেন না। বুথের বাইরে বেরিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছি, পকেটে বেজে উঠল ফোন। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অন্যতম ছায়া, ফোনে জানালেন ম্যাডাম যাচ্ছেন ৬ নং বুথে। তোমরা কোথায়? বললাম ৬ নয় ৭ এ নিয়ে এসো… আমাদের ফোনালাপ ততক্ষনে কানে গেছে কোন অজানা গেরুয়া নেতার। শুরু হল জমায়েত। বুঝলাম পরিস্থিতি সুবিধার নয়। আরও প্রায় ২০ মিনিট পর মানুষের দৌড়াদৌড়ি দেখে বুঝলাম… মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসেগেছেন। সাথে অন্তত ৫০ ধরনের সংবাদমাধ্যম।

ভোট… এবং..প্রহসন…. দিনের শুরুতে প্রথম ২ ঘণ্টায় ৮০ টি বুথে এজেন্ট ছিলনা তৃণমূলের। বাতাসে তখন গুঞ্জন ভোট করাচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামে প্রদত্ত ভোট সেই সময় ২০ শতাংশের কিছু বেশি। এরপর ৭০ টি বুথে তৃণমূলের এজেন্ট বসান হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের তৎপরতায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খবর পাওয়ার পর ৭ নং বুথে গিয়ে বসে থাকেন ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট। যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত হন সেই বুথে তখন সার্বিক ভাবে নন্দীগ্রামে ভোট পড়ে গিয়েছে ৬০ শতাংশ। শুভেন্দু মুখোমুখি না হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকেন মুখ্যমন্ত্রী কখন ওই এলাকা ছাড়বেন। দেশের সব মিডিয়া, পুলিশ, প্রশাসনের শীর্ষ কর্তা, কমিশনের আধিকারিকরা মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ শুনতে এবং অভিযোগ নিরসন করতে ব্যাস্ত থাকেন। সংবাদমাধ্যমে একচেটিয়া মুখ্যমন্ত্রীর খবর। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মুখ্যমন্ত্রী যখন বুথে ঢুকলেন তখন তাঁরসাথে কোন তৃণমূল নেতা ছিলেন না। এমনকি শেখ সুফিয়ানও না। মুখ্যমন্ত্রী যখন বুথ ছাড়লেন তাঁর কিছুক্ষন পর বিকেল ৫টার ভোট শতাংশ সামনে এল, ৮০.৭৯ শতাংশ। (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোটেই বিক্ষোভে আটকে ছিলেন না। বুথ থেকে বেরোনোর রাস্তা তৃণমূল কর্মী সমর্থকদের দখলে ছিল। অন্তত ১৫০ মিটার দূরে বিজেপি কর্মীরা ছিল, যা সম্পূর্ণ উল্টোদিকে)শুভেন্দু অধিকারী যখন ওই নির্দিষ্ট বুথ ছেড়ে আবার পরিক্রমায় বেরোলেন, তখন হাসিমুখে শেখ সুফিয়ানের সাথে পার্টি অফিসে বসে মুড়ি খাওয়া শুরু করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছুক্ষন পরে ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হয়। দেখা যায় সার্বিকভাবে নন্দীগ্রামে ভোট পড়েছে… ৮৮.০১ শতাংশ। যারা রাজনীতির অঙ্ক কষতে ভালবাসেন… অঙ্ক কষে নিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here