পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রকাশের পর থেকেই শিল্পমহলে ইতিবাচক সাড়া মিলতে শুরু করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিল্পোন্নয়ন, কৃষি এবং পর্যটন খাতে একাধিক বড় প্রকল্প ও বরাদ্দের ঘোষণা শিল্পপতিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। রাজ্যের অর্থনৈতিক পুনরুত্থান এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে এই বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলেই মনে করছে শিল্পমহলের একাংশ।
অম্বুজা নেওটিয়া গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়ার মতে, এবারের বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল সামগ্রিক উন্নয়নের ভাবনা। তিনি বলেন, অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রকে আলাদা করে না দেখে একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। নতুন বিমানবন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ এবং শিল্প উন্নয়নের রূপরেখাকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ঘোষিত প্রকল্পগুলি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিনিয়োগের দরজা খুলবে।
আরপিএসজি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সঞ্জীব গোয়েঙ্কাও বাজেটের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির চাহিদা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করা হয়েছে। শিল্প, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অবকাঠামো এবং পরিচ্ছন্ন শক্তি খাতে সরকারের বিশেষ গুরুত্ব নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে। তিনি এই বাজেটকে ‘দূরদর্শী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
কেভেন্টার গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান ময়ঙ্ক জালানও শিল্প ও কৃষিকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ, কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উপর জোর দেওয়ার ফলে রাজ্যের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রিয়েল এস্টেট ক্ষেত্র থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে। পুর্তি রিয়্যালটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মহেশ আগরওয়াল মনে করেন, এই বাজেট বিনিয়োগকারী এবং নির্মাণ শিল্পের কাছে আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে চিংড়িহাটা-নিউ টাউন এলিভেটেড করিডর এবং কল্যাণীতে গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর তৈরির ঘোষণাকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা রিয়েল এস্টেট খাতের বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
লেজার পাওয়ার অ্যান্ড ইনফ্রার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দীপক গোয়েল বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। ১২টি শহরে ১৫টি নতুন সাব-স্টেশন নির্মাণ এবং ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ কেবল ব্যবস্থার সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত বিদ্যুৎ পরিষেবাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে বলে মনে করছেন তিনি। পাশাপাশি ব্যবসার জন্য সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনারও প্রশংসা করেছেন।
জিইইসিএল-এর ভাইস চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর প্রশান্ত মোদীর মতে, শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে এবারের বাজেট অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, শিল্পের জন্য জমির তালিকা প্রস্তুত করা এবং তোলাবাজি রোধে নতুন আইন আনার প্রস্তাবকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
অ্যাসোচ্যামের চেয়ারম্যান তরণজিৎ সিংও রাজ্য বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘বিকশিত ভারত’-এর বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক সুবিধা, দক্ষ শ্রমশক্তি, বন্দর, শিল্প পরিকাঠামো এবং বৃহৎ বাজারকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সব মিলিয়ে শিল্পমহলের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ বাজেট ২০২৬ শুধুমাত্র সরকারি ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং রাজ্যের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের নতুন রূপরেখা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এখন নজর থাকবে ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের গতির দিকে।



