অকারণে তৈলমর্দন নয়, ১০০ দিনে ভোটের ২৫ প্রতিশ্রুতির কতটা পূরণ করল বিজেপি সরকার?

১০০ দিন পূর্তিতে সরকারের সাফল্যের প্রচার শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতির তালিকা সামনে রেখে দেখা যাক—কোনগুলি বাস্তবে হয়েছে, কোনগুলি প্রক্রিয়াধীন, আর কোনগুলির এখনও কোনও স্পষ্ট বাস্তবায়ন নেই।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা: ৯ মে ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। ১৭ জুলাই তাঁর সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে। বিজেপির দাবি, নির্বাচনী সংকল্পপত্রের প্রায় ৪৩ শতাংশ প্রতিশ্রুতির কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন। কিন্তু সরকারের নিজের রিপোর্ট কার্ডের পাশাপাশি ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির তালিকা মিলিয়ে দেখলে ছবিটা কতটা একই? ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ধরে খতিয়ে দেখল নজরবন্দি।

১০০ দিন পূর্ণ হওয়াকে কেন্দ্র করে বঙ্গ বিজেপি ৪১ পাতার ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংকল্প এবং সাফল্যের ১০০ দিন’ নামে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। সেই রিপোর্ট রাজ্যের প্রায় চার কোটি ভোটারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচিও নিয়েছে দল। অর্থাৎ সরকার নিজের কাজের হিসাব মানুষের সামনে রাখতে চাইছে।

কিন্তু এখানেই সংবাদমাধ্যমের দ্বিতীয় দায়িত্ব শুরু হয়। সরকার কী বলছে, সেটি জানানো যেমন জরুরি, তেমনই নির্বাচনের আগে কী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং ১০০ দিনের মধ্যে তার বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে—সেটিও যাচাই করা জরুরি। কারণ ‘ঘোষণা’, ‘কাজ শুরু’ এবং ‘সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন’—এই তিনটি এক কথা নয়।

তাই এই প্রতিবেদনে ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিকে তিনটি ভাগে দেখা হচ্ছে—🟢 বাস্তবায়িত, 🟡 প্রক্রিয়াধীন/আংশিক, 🔴 এখনও পূরণ হয়নি বা ১০০ দিনের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রমাণ নেই। যেখানে প্রতিশ্রুতির সময়সীমা ১০০ দিনের বেশি, সেখানে তাকে ব্যর্থ বলা হয়নি।

১. মহিলাদের মাসে ₹৩,০০০ — 🟢 বাস্তবায়িত

বিজেপির অন্যতম বড় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল রাজ্যের মহিলাদের মাসে ₹৩,০০০ করে দেওয়া। ক্ষমতায় এসে সরকার ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ চালু করেছে। সরকারি ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলারা মাসে ₹৩,০০০ পাওয়ার অধিকারী।

২. মহিলাদের বিনামূল্যে সরকারি বাস — 🟢 বাস্তবায়িত

১ জুন থেকে রাজ্যের সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াত চালু হয়েছে। এটি বিজেপির ইস্তাহারের অন্যতম স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল এবং ১০০ দিনের আগেই বাস্তবে কার্যকর হয়েছে।

৩. সপ্তম বেতন কমিশন — 🟡 প্রক্রিয়াধীন

বিজেপি ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার অবশ্য সপ্তম রাজ্য বেতন কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু কমিশন গঠন এবং নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়া এক জিনিস নয়। তাই ১০০ দিনের হিসাবে এটিকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত বলা যাবে না।

৪. সরকারি কর্মীদের DA — 🟡 আংশিক

ইস্তাহারে সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের DA নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রথম বাজেটে আরও ২০ শতাংশ DA বৃদ্ধির ঘোষণা হয়েছে, যা অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। ফলে ১০০ দিনের সময়সীমায় এটিকে পুরোপুরি বাস্তবায়িত বলা যাবে না।

৫. এক লক্ষ সরকারি চাকরি — 🟡 ঘোষণা ও প্রক্রিয়া

বাজেটে এক লক্ষ সরকারি শূন্যপদ পূরণের ঘোষণা এসেছে। তার মধ্যে ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ঘোষণা মানেই এক লক্ষ নিয়োগ সম্পন্ন নয়। ১০০ দিনের স্কোরকার্ডে তাই এটি এখনও প্রক্রিয়াধীন।

৬. সরকারি চাকরিতে মহিলাদের ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ — 🟡 নীতিগত পদক্ষেপ

বিজেপির ইস্তাহারে সমস্ত সরকারি চাকরি, পুলিশ-সহ, ৩৩ শতাংশ মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি ছিল। প্রথম পূর্ণ বাজেটে এক লক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের ঘোষণা এসেছে। তবে সেই নিয়োগ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।

৭. বেকার যুবকদের মাসে ₹৩,০০০ — 🟡 প্রক্রিয়াধীন

বিজেপি বেকার যুবকদের মাসে ₹৩,০০০ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। বাজেটে ‘বাংলার যুবসাথী’ প্রকল্পের ঘোষণা হয়েছে এবং ১৫ অগস্ট ২০২৬ থেকে প্রকল্পটি শুরু করার কথা বলা হয়েছিল। ফলে এটি ১০০ দিনের মধ্যে নীতিগতভাবে এগিয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিচার করার সময় এখনও আসেনি।

৮. চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ₹১৫,০০০ — 🟡 স্পষ্ট পূর্ণ বাস্তবায়নের তথ্য নেই

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য চাকরিপ্রার্থীদের এককালীন ₹১৫,০০০ সহায়তার প্রতিশ্রুতি ছিল। ১০০ দিনের পর্যায়ে এই সুবিধা রাজ্যজুড়ে কতজন পেয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে নেই।

৯. পরীক্ষার অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্তদের বয়সে ছাড় — 🟢/🟡 পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে

নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়মে ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের বয়সে অতিরিক্ত ছাড়ের প্রতিশ্রুতি ছিল। নতুন সরকার সরকারি নিয়োগে upper-age limit বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি বাস্তব প্রশাসনিক পদক্ষেপ হলেও প্রতিশ্রুতির সমস্ত সুবিধা কতজন পেয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব আলাদা করে প্রয়োজন।

১০. কৃষকদের ধান ₹৩,১০০ প্রতি কুইন্টালে কেনা — 🟡 যাচাই প্রয়োজন

বিজেপির ইস্তাহারে ধান ₹৩,১০০ প্রতি কুইন্টাল দরে কেনার প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ১০০ দিনের মধ্যে রাজ্যজুড়ে ওই দরে কতটা ধান বাস্তবে কেনা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান ছাড়া প্রতিশ্রুতিটিকে ‘সম্পূর্ণ পূরণ’ বলা যাচ্ছে না।

১১. PM-Kisan-এর সঙ্গে রাজ্যের অতিরিক্ত ₹৩,০০০ — 🟡 বাস্তবায়নের পূর্ণ হিসাব নেই

কৃষকদের বার্ষিক সহায়তা বাড়িয়ে ₹৯,০০০ করার প্রতিশ্রুতি ছিল। এটি দীর্ঘমেয়াদি কৃষি-সহায়তা কাঠামোর অংশ। ১০০ দিনের মধ্যে কতজন কৃষক অতিরিক্ত রাজ্য সহায়তা পেয়েছেন, তার স্পষ্ট পরিসংখ্যান প্রয়োজন।

১২. UCC ছ’মাসের মধ্যে — 🟡 সময়সীমা এখনও শেষ হয়নি

Uniform Civil Code বা UCC ছ’মাসের মধ্যে চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ১০০ দিন পূর্ণ হলেও ছ’মাসের সময়সীমা এখনও শেষ হয়নি। তাই এখনই এটিকে ব্যর্থ বলা যেমন ভুল, তেমনই ‘পূরণ হয়ে গিয়েছে’ বলাও ভুল।

১৩. সীমান্ত সুরক্ষা ও BSF-কে জমি — 🟢 দৃশ্যমান অগ্রগতি

সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য জমি হস্তান্তর ছিল নতুন সরকারের প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলির একটি। বিজেপির ১০০ দিনের রিপোর্টেও এটিকে প্রধান সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

১৪. অনুপ্রবেশ বন্ধ — 🟡 দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি

‘Detect, Delete, Deport’ নীতির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ বন্ধের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ১০০ দিনে অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে—এমন কোনও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। এটি তাই সরকারের সামনে চলমান বড় পরীক্ষা।

১৫. দুর্নীতির শ্বেতপত্র — 🟡 প্রক্রিয়াধীন

বিজেপি ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকার দুর্নীতি ও অতীতের প্রশাসনিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্তমূলক পদক্ষেপ শুরু করেছে। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশই ছিল মূল প্রতিশ্রুতি—সেটি ১০০ দিনে সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাবে না।

১৬. রাজনৈতিক হিংসার তদন্ত কমিশন — 🟡 প্রক্রিয়াধীন

অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা তদন্তের প্রতিশ্রুতি ছিল। এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদি তদন্তমূলক প্রক্রিয়া। তাই ১০০ দিনের স্কোরকার্ডে ‘চলমান’ হিসেবে রাখাই যুক্তিযুক্ত।

১৭. নারী নিরাপত্তায় Durga Suraksha Squad — 🟡 প্রশাসনিক পদক্ষেপ

নারী নিরাপত্তার জন্য বিশেষ বাহিনী ও self-defence squad তৈরির প্রতিশ্রুতি ছিল। বাজেটেও প্রতিটি মহকুমায় মহিলা পুলিশ স্টেশন এবং প্রতিটি থানায় মহিলা help desk-এর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়েছে, তবে এর কার্যকারিতা বিচার করতে মাঠপর্যায়ের তথ্য আরও জরুরি।

১৮. আয়ুষ্মান ভারত — 🟢 বাস্তবায়িত

পশ্চিমবঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত কার্যকর করা নতুন সরকারের ১০০ দিনের অন্যতম প্রধান দাবি। বিজেপির রিপোর্ট কার্ডেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।

১৯. গর্ভবতী মহিলাদের ₹২১,০০০ ও পুষ্টি কিট — 🟡 পূর্ণ বাস্তবায়নের হিসাব নেই

বিজেপির ইস্তাহারে গর্ভবতী মহিলাদের ₹২১,০০০ আর্থিক সহায়তা এবং ছ’টি পুষ্টি কিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। ১০০ দিনের মধ্যে রাজ্যজুড়ে কতজন এই সুবিধা পেয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে না থাকায় এটিকে এখনও বাস্তবায়িত বলা যাচ্ছে না।

২০. ৭৫ লক্ষ ‘লখপতি দিদি’ — 🔴 ১০০ দিনে বিচারযোগ্য নয়

পাঁচ বছরে ৭৫ লক্ষ মহিলাকে ‘লখপতি দিদি’ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি। তাই ১০০ দিনে সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় দেওয়া সম্ভব নয়।

২১. উত্তরবঙ্গে AIIMS, IIT, IIM — 🟡 পরিকল্পনা/ঘোষণা

উত্তরবঙ্গে AIIMS, IIT, IIM এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিশ্রুতি ছিল। বাজেটেও IIT ও IIM-এর প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান গড়তে জমি, অনুমোদন, অর্থ বরাদ্দ ও নির্মাণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। ফলে ১০০ দিনে এগুলিকে ‘সম্পূর্ণ’ বলা যাবে না।

২২. ব্লু ইকোনমির রোডম্যাপ — 🟡 ১০০ দিনের প্রতিশ্রুতি, পূর্ণ ফলাফল যাচাই বাকি

বিজেপির ইস্তাহারে ১০০ দিনের মধ্যে Blue Economy-এর রোডম্যাপ তৈরির প্রতিশ্রুতি ছিল। এখানে সরকারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রোডম্যাপটি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ, নাকি নির্দিষ্ট প্রকল্প, অর্থায়ন ও সময়সীমা-সহ প্রকাশিত হয়েছে?

২৩. শিল্প ও বিনিয়োগ — 🟡 প্রস্তাব এসেছে, বাস্তব বিনিয়োগের পরীক্ষা বাকি

সরকারের ১০০ দিনের রিপোর্টে ₹৫৪,০০০ কোটির বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংখ্যাটি বড় হলেও এখানে সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যায়—MoU বা investment proposal কতটা বাস্তব প্রকল্পে পরিণত হল? কতগুলি কারখানা তৈরি হল এবং কত স্থায়ী কর্মসংস্থান হল—তার হিসাবই শেষ কথা।

২৪. চা-বাগান, পাট ও উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি — 🟡 দীর্ঘমেয়াদি কাজ

চা-বাগান পুনরুজ্জীবন, দার্জিলিং চায়ের আন্তর্জাতিক বাজার বাড়ানো এবং পাটশিল্প আধুনিকীকরণের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু এগুলির ফল ১০০ দিনে মাপা সম্ভব নয়। বাস্তব সাফল্য বিচার করতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, শ্রমিক আয় ও রপ্তানির তথ্য প্রয়োজন।

২৫. কর্মসংস্থান ও এক কোটি চাকরি/স্বনিযুক্তি — 🔴 ১০০ দিনে পূর্ণ বাস্তবায়ন নয়

পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান ও স্বনিযুক্তির সুযোগ তৈরির লক্ষ্য ছিল। ১০০ দিনে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে এক লক্ষ সরকারি নিয়োগের ঘোষণা থেকে বাস্তব নিয়োগ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে বাস্তব চাকরি—দুই ক্ষেত্রেই পরবর্তী রিপোর্টে পরিমাপযোগ্য সংখ্যা দিতে হবে।

তাহলে ১০০ দিনের Scorecard কী বলছে?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিজেপি নিজেই দাবি করছে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রায় ৪৩ শতাংশের কাজ ১০০ দিনে সম্পন্ন হয়েছে। অমিত শাহও প্রকাশ্যে সেই দাবি করেছেন।

কিন্তু ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি আলাদা করে দেখলে দেখা যাচ্ছে, সবকটিকে একই ‘পূরণ’ খাতায় রাখা যায় না।

🟢 স্পষ্টভাবে বাস্তবায়িত/দৃশ্যমান:
অন্নপূর্ণা যোজনা, মহিলাদের সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত, আয়ুষ্মান ভারত কার্যকর করা এবং সীমান্তে BSF-এর জন্য জমি হস্তান্তরের মতো পদক্ষেপ।

🟡 প্রক্রিয়াধীন/আংশিক:
সপ্তম বেতন কমিশন, DA, এক লক্ষ সরকারি চাকরি, ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ, যুবসাথী, UCC, নারী নিরাপত্তা, কৃষকদের ₹৩,১০০ ধান ক্রয়, শিল্প বিনিয়োগ, উত্তরবঙ্গের AIIMS-IIT-IIM এবং ব্লু ইকোনমি।

🔴 এখনও পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রমাণ নেই বা দীর্ঘমেয়াদি:
এক কোটি কর্মসংস্থান, ৭৫ লক্ষ লখপতি দিদি, রাজনৈতিক হিংসার পূর্ণ তদন্ত, দুর্নীতির পূর্ণ শ্বেতপত্র এবং একাধিক বড় পরিকাঠামোগত প্রতিশ্রুতি।

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি—এই ২৫টি প্রতিশ্রুতি পুরো ইস্তাহারের ২৫টি মাত্র প্রতিশ্রুতি নয়; বরং ভোটের আগে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ এবং জনজীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন ২৫টি প্রতিশ্রুতির নির্বাচিত স্কোরকার্ড। তাই এগুলির শতাংশকে বিজেপির ঘোষিত ৪৩ শতাংশের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না।

১০০ দিনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা হল ₹৫৪ হাজার কোটির বেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব। এটিকে সরকারের সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করা যায়, কিন্তু প্রস্তাব এবং বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য রাখতেই হবে। কারখানা তৈরি, উৎপাদন শুরু এবং চাকরি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সেই সংখ্যাকে ‘বাস্তব বিনিয়োগ’ বলা সাংবাদিকতার বিচারে ঠিক হবে না।

একইভাবে, এক লক্ষ সরকারি চাকরির ঘোষণা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু চাকরির বিজ্ঞপ্তি, পরীক্ষা, মেধাতালিকা, নিয়োগপত্র এবং বাস্তবে কর্মস্থলে যোগদান—প্রতিটি ধাপের সংখ্যা প্রকাশ না হলে ‘এক লক্ষ চাকরি দেওয়া হয়েছে’ বলা যাবে না।

১০০ দিন তাই কোনও সরকারের চূড়ান্ত রিপোর্ট কার্ড নয়। কিন্তু এটি দিকনির্দেশের প্রথম পরীক্ষা। বিশেষ করে যে প্রতিশ্রুতিগুলির ক্ষেত্রে বিজেপি নিজেই ৪৫ দিন, ১০০ দিন বা ছ’মাসের মতো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়েছিল, সেগুলির ক্ষেত্রে প্রশ্ন করার অধিকার নাগরিকের রয়েছে।

অকারণে তৈলমর্দন যেমন সংবাদমাধ্যমের কাজ নয়, তেমনই রাজনৈতিক বিদ্বেষে প্রতিটি সরকারি পদক্ষেপকে খারিজ করাও সাংবাদিকতা নয়। অন্নপূর্ণা চালু হলে সেটি বলতে হবে, বিনামূল্যে বাস চালু হলে সেটিও স্বীকার করতে হবে; আবার এক লক্ষ চাকরির ঘোষণা আর এক লক্ষ নিয়োগের মধ্যে ফারাক থাকলে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। সরকার নিজের রিপোর্ট কার্ড মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে—এবার সংবাদমাধ্যমের কাজ সেই রিপোর্ট কার্ডের পাশে নির্বাচনী ইস্তাহার এবং বাস্তবের হিসাবটাও রাখা। ১০০ দিনের ‘ধন্য ধন্য’ নয়, দরকার ৫ বছরের প্রতিশ্রুতির প্রথম কিস্তির হিসাব।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন