অর্ক সানা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (Jawaharlal Nehru University)—ভারতের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে এই দুই নামের আলাদা মর্যাদা রয়েছে। আবার রাজনৈতিক ইতিহাসেও দু’টি প্রতিষ্ঠান ব্যতিক্রমী। দীর্ঘদিন ধরে মুক্তচিন্তা, ছাত্র আন্দোলন এবং বামপন্থী রাজনীতির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ই বারবার দক্ষিণপন্থী ছাত্র রাজনীতির টার্গেটে এসেছে। দিল্লির JNU-তে বছরের পর বছর চেষ্টা করেও ABVP বামপন্থী রাজনৈতিক আধিপত্য পুরোপুরি ভাঙতে পারেনি। এবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর যাদবপুরে ABVP-র আগ্রাসী সক্রিয়তা কি সেই পুরনো লড়াইকে নতুন মাত্রা দিল?
প্রশ্নটা তাই শুধু সাম্প্রতিক যাদবপুরের সংঘর্ষ নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও বড়—ভারতের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন দুই বিশ্ববিদ্যালয়কেই কি বিজেপি-আরএসএসের ছাত্র রাজনীতি নিজেদের মতাদর্শের ‘জয়’ প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে দেখে?
১৯ অগস্ট রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে Faculty of Engineering and Technology Students’ Union-এর সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে যে সংঘর্ষের সূত্রপাত, তা রাত পেরিয়ে পরের দিনও গড়ায়। ABVP এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির মধ্যে সংঘর্ষে একাধিক ছাত্র আহত হন। ইট-পাথর ছোড়া, আগুন লাগানো, ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির অভিযোগ সামনে আসে। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ফের দুই পক্ষের মুখোমুখি সংঘর্ষ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে।
এই ঘটনার সবচেয়ে প্রতীকী ছবি সম্ভবত যাদবপুরের ঐতিহাসিক এমব্লেমকে ঘিরে। শিল্পী নন্দলাল বসুর (Nandalal Bose) নকশা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রতীকটি সংঘর্ষের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে গেটের উপরে ওঠা এবং এমব্লেমের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য সামনে এসেছে। ABVP অবশ্য এমব্লেম ভাঙার দায় অস্বীকার করেছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
কিন্তু যাদবপুরের এমব্লেমে আঘাতের ঘটনাটি নিছক ভাঙচুরের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। নন্দলাল বসু শুধুমাত্র একজন শিল্পী ছিলেন না; ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান অনন্য। আর যাদবপুরের এই প্রতীক তার প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের অংশ। সেই প্রতীক রাজনৈতিক সংঘর্ষের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর রাজনীতির চাপ কতটা বেড়েছে, তারই ভয়াবহ প্রতীক।
এখানেই ফিরে আসতে হয় যাদবপুরের ইতিহাসে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী শিক্ষাচিন্তার পরম্পরা থেকে National Council of Education-এর জন্ম। সেই ঐতিহাসিক ধারার উত্তরসূরি হিসেবেই ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। ষাটের দশকের শেষভাগে নকশাল আন্দোলনের অভিঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে ওঠে ছাত্র বিদ্রোহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
কিন্তু যাদবপুরকে শুধুই ‘সিপিএমের ক্যাম্পাস’ বলা ইতিহাসের প্রতি অন্যায়। বরং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়েছে বামপন্থী, বিপ্লবী বাম এবং স্বাধীন ছাত্র সংগঠনগুলির দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে। DSF, FAS, WTI-সহ একাধিক স্বাধীন বা বামঘেঁষা সংগঠন বহু দশক ধরে ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণ করেছে। সেই রাজনীতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য—মূলধারার রাজনৈতিক দলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার প্রবণতা।
আর এই কারণেই যাদবপুরকে দখল করা বিজেপির কাছে নিছক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংগঠন শক্তিশালী করার বিষয় নয়। এটি একটি প্রতীকী রাজনৈতিক জয় হতে পারে। কারণ যে ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে স্বাধীন ও বামপন্থী ছাত্র রাজনীতি মূলধারার দলীয় রাজনীতির থেকেও বেশি শক্তিশালী, সেখানে ABVP-র শক্তি প্রদর্শন মানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি পুরনো স্তম্ভকে চ্যালেঞ্জ করা।
এই জায়গায় JNU-র সঙ্গে যাদবপুরের মিলটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। JNU-র ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসেও বামপন্থী সংগঠনগুলির আধিপত্য দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর ABVP-র ভোট এবং সাংগঠনিক প্রভাব বাড়লেও বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিকে সরিয়ে দিতে পারেনি। ২০১৪ সালের JNU Students’ Union নির্বাচনে ABVP-র ভোট উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও AISA-র প্রার্থী অশুতোষ কুমার সভাপতি নির্বাচিত হন।
JNU-তে ABVP-র উত্থান অবশ্য অস্বীকার করার উপায় নেই। বরং গত এক দশকে সংগঠনটি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। কিন্তু সেই উত্থানকে ‘বাম দুর্গ সম্পূর্ণ দখল’ বলা যাবে না। JNU-র রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বামপন্থী সংগঠনগুলির গভীর সাংগঠনিক শিকড় এখনও রয়েছে। ২০২৪ সালেও JNU-র রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে ছিল বাম জোট ও ABVP-র টানাপোড়েন।
অর্থাৎ ২০১৪-র ‘মোদি ঝড়’ দিল্লির JNU-তে পৌঁছেছিল, ABVP-র শক্তি বাড়িয়েছিল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক DNA রাতারাতি বদলে দিতে পারেনি। আর যাদবপুরে পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ এখানে কোনও একটি বাম দলের একচ্ছত্র আধিপত্য নেই; বরং স্বাধীন ছাত্র রাজনীতির নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে বাইরে থেকে রাজনৈতিক শক্তি এনে ক্যাম্পাসের মতাদর্শ বদলে ফেলা আরও কঠিন।
২০২০ সালে যাদবপুরে ছাত্র নির্বাচন যখন শেষবার হয়েছিল, ABVP FETSU-তে দ্বিতীয় হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রথম স্থানে থাকা DSF-এর সঙ্গে তাদের ব্যবধান ছিল ২,৭৯৬ ভোট। অন্য ফ্যাকাল্টিগুলিতে ABVP-র প্রভাবও সীমিত ছিল। ২০১৪ সালে মোদি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্যাম্পাসে ABVP-র উপস্থিতি তৈরি হলেও জনপ্রিয় গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে সংগঠনটি বড় সাফল্য পায়নি—এমনটাই উঠে এসেছিল যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতি নিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণে।
তাহলে এবার এতটা আক্রমণাত্মকতা কেন?
কারণ রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে গেছে। ২০১৪ সালে দিল্লিতে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তখনও বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি সীমিত ছিল। ২০২৬ সালে ছবিটা উল্টো। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এখন ক্ষমতাসীন দল। ফলে ABVP-র ক্যাম্পাস রাজনীতির পিছনে যে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা আগের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা।
যাদবপুরের ঘটনায় সেই নতুন ক্ষমতার আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট বলে মনে করছেন অনেকে। বিজেপির মধ্যেও অবশ্য এক সুর নেই। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত (Swapan Dasgupta) যাদবপুরে রাজনৈতিক দলের উস্কানি থেকে দূরে থাকার কথা বলেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh) যাদবপুরে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’-এর মতো কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন।
এই দুই বক্তব্যের পার্থক্যই আসলে বর্তমান পরিস্থিতির রাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝায়। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রক্ষার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ‘দখল’ ও ‘শুদ্ধিকরণ’-এর ভাষা রাজনৈতিক পরিসরে জায়গা করে নিচ্ছে। প্রশ্ন হল, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিকে কি সত্যিই ‘শত্রু দখল’ হিসেবে দেখা হচ্ছে?
কারণ যাদবপুরে বামপন্থীরা শক্তিশালী—এই সত্য কোনও অপরাধ নয়। JNU-তে বামপন্থীরা দীর্ঘদিন শক্তিশালী—সেটিও কোনও অপরাধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে মতাদর্শে বিশ্বাস করবেন, সেটি ভোট, বিতর্ক, সংগঠন এবং রাজনৈতিক কাজের মাধ্যমে বদলাতে হয়। লাঠি, পতাকা, বহিরাগত বাহিনী কিংবা ক্ষমতার দাপট দিয়ে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক চেতনা বদলানো যায় না।
বরং এই জায়গাতেই ABVP-র জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। যদি সত্যিই যাদবপুরের ছাত্রদের সমর্থন থাকে, তাহলে ছাত্র নির্বাচন হোক। প্রার্থী দিন। ইশতেহার দিন। ছাত্রদের কাছে যান। ভোট চান। জিতুন। তারপর প্রমাণ করুন যে যাদবপুরের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গেছে।
কিন্তু সেই পথে না গিয়ে যদি ঐতিহাসিক এমব্লেমের উপর পা রেখে পতাকা উঁচিয়ে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনই সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এটা কি ছাত্র রাজনীতি, নাকি ক্ষমতার প্রদর্শন?
যাদবপুরের ইতিহাসও বলে, এই ক্যাম্পাসকে বাইরে থেকে নির্দেশ দিয়ে চালানো সহজ নয়। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম থেকে ‘হোক কলরব’—বহু রাজনৈতিক আন্দোলনে যাদবপুর নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। ২০১৪ সালের ‘হোক কলরব’ আন্দোলনও দেখিয়েছিল, ক্যাম্পাসের ছাত্ররা নিজেদের প্রশ্নে কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে।
JNU-র ইতিহাসও একই শিক্ষা দেয়। সেখানে ABVP শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু বাম রাজনীতি নিশ্চিহ্ন হয়নি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় দখল করা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মন জয় করা এক জিনিস নয়।
এবার প্রশ্নটা তাই সরাসরি—দিল্লির JNU-তে যে বামপন্থী রাজনৈতিক পরম্পরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে, সেই একই মডেল কি এবার বাংলার যাদবপুরে প্রয়োগ করতে চাইছে ABVP?
যদি তাই হয়, তাহলে সামনে লড়াইটা সহজ হবে না। কারণ যাদবপুর শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়; এটি বাংলার রাজনৈতিক স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নন্দলাল বসুর এমব্লেমে আঘাত সেই স্মৃতির উপরই যেন একটি রাজনৈতিক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
ABVP হয়তো যাদবপুরে আরও শক্তিশালী হবে। বিজেপি হয়তো সংগঠন বাড়াবে। বাম ছাত্র সংগঠনগুলিও হয়তো নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করবে। কিন্তু শেষ কথা বলবে যাদবপুরের ছাত্ররাই। পতাকা কে আগে লাগাল, কে কাকে ধাক্কা দিল—তা দিয়ে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের জয় হয় না। জয় হয় যখন ছাত্ররা ভোট দিয়ে বলে, “আমরা তোমাকে চাই।”
দিল্লির JNU-র ইতিহাস যদি কোনও শিক্ষা দেয়, তা হল—ক্ষমতার ঝড় ক্যাম্পাসের গেট পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক চেতনা দখল করা যায় না এত সহজে। এবার বাংলার যাদবপুর সেই পরীক্ষার সামনে। দিল্লিতে যেখানে পারেনি, বাংলার ক্ষমতা হাতে নিয়ে ABVP কি সত্যিই যাদবপুরের বাম দুর্গ ভাঙতে পারবে—নাকি প্রতিরোধের নতুন অধ্যায়ের জন্ম দেবে এই ক্যাম্পাসই?



