অপারেশন সিঁদুর (Operation Sindoor)-এর সময় পাকিস্তানের কিরানা হিলস (Kirana Hills) এলাকায় ভারতীয় একটি ড্রোন আছড়ে পড়েছিল—এবার সেই ঘটনার নেপথ্যের তথ্য সামনে আনলেন প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ (CDS) জেনারেল অনিল চৌহান (Anil Chauhan)। তাঁর বক্তব্য, ঘটনাটি কোনও পরিকল্পিত পরমাণু স্থাপনায় হামলা ছিল না। সারগোদা এলাকার রাডার খুঁজতে পাঠানো একটি লইটারিং মিউনিশন জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর কিরানা হিলসের কাছে আছড়ে পড়ে।
অপারেশন সিঁদুরের সময় কিরানা হিলসকে ঘিরে নানা জল্পনা ছড়িয়েছিল। পাকিস্তানের এই এলাকা তাদের পারমাণবিক পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বলে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি উঠেছিল, ভারত সেখানে সরাসরি হামলা চালিয়েছে এবং তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়েছে। ভারত অবশ্য কিরানা হিলসকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি খারিজ করেছিল। এবার সেই রহস্যের ব্যাখ্যা দিলেন তৎকালীন সামরিক নেতৃত্বের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তি।
নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেনারেল অনিল চৌহান জানান, অপারেশন চলাকালীন সারগোদা ও তার আশপাশের এলাকায় একাধিক লইটারিং মিউনিশন পাঠানো হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের রাডার ব্যবস্থার সন্ধান করা এবং প্রয়োজন হলে সেগুলিকে নিশানা করা।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ধরনের ড্রোন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আকাশে চক্কর দিয়ে লক্ষ্যবস্তু খোঁজে। প্রায় দু’ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার ক্ষমতা থাকা এই অস্ত্র নির্দিষ্ট লক্ষ্য না পেলে শেষ পর্যন্ত অন্য কোনও জায়গায় আঘাত হানতে পারে। কিরানা হিলসের ক্ষেত্রে তেমনই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করছেন তিনি।
জেনারেল চৌহান আরও জানান, তৎকালীন এয়ার অপারেশনসের ডিরেক্টর জেনারেল এয়ার মার্শাল এ কে ভারতী (A K Bharti) তাঁকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে কিরানা হিলস ভারতের নির্ধারিত লক্ষ্য ছিল না। তাঁর কথায়, ওই এলাকায় ড্রোন পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল সারগোদা ঘিরে থাকা রাডারগুলির অবস্থান শনাক্ত করা।
প্রাক্তন CDS-এর বক্তব্যে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। তাঁর দাবি, ভারতীয় বায়ুসেনাকে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের স্কার্দু (Skardu) এলাকায় হামলার অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া প্রতিকূল হয়ে যাওয়ায় সেই পরিকল্পনা কার্যকর করা যায়নি। পরে লক্ষ্য পরিবর্তন করে ভোলারি (Bholari)-র দিকে অভিযান চালানো হয়।
অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল পাকিস্তানের সামরিক পরিকাঠামোয় ভারতীয় হামলা। সারগোদা ছিল সেই কৌশলগত এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কিরানা হিলসও সারগোদার কাছেই অবস্থিত। ফলে ওই অঞ্চলে ড্রোন অভিযান চালানোর সামরিক প্রেক্ষাপট ছিল, কিন্তু কিরানা হিলসকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল—এমন দাবি জেনারেল চৌহানের বক্তব্যে নেই।
ড্রোনটির নির্দিষ্ট মডেল সম্পর্কে জেনারেল চৌহান সরাসরি চূড়ান্ত ঘোষণা করেননি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এটিকে ইজরায়েলি নকশার হারপ (Harop) ধরনের লইটারিং মিউনিশন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ধরনের অস্ত্র দীর্ঘ সময় নির্দিষ্ট এলাকায় ঘোরাফেরা করে লক্ষ্য শনাক্ত করার পর আঘাত হানতে সক্ষম।
এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন CDS হিসেবে জেনারেল চৌহান ড্রোন যুদ্ধের গুরুত্ব এবং দেশীয় প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখেছিলেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্যেও অপারেশন সিঁদুরে UAV ও কাউন্টার-UAS ব্যবস্থার কৌশলগত গুরুত্বের কথা উঠে এসেছিল।
স্কার্দু অভিযান বাতিলের ঘটনাটিও অপারেশন সিঁদুরের সামরিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। আবহাওয়ার কারণে একটি নির্ধারিত লক্ষ্য বদল করতে হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ভোলারির সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। স্যাটেলাইট ছবিতে ওই হামলায় একটি হ্যাঙ্গারের উল্লেখযোগ্য ক্ষতির চিহ্নও দেখা গিয়েছিল।
ফলে কিরানা হিলস নিয়ে এতদিনের জল্পনার ক্ষেত্রে জেনারেল অনিল চৌহানের বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা সামনে আনল। ভারতীয় ড্রোন ওই এলাকায় আছড়ে পড়েছিল—কিন্তু সেটিকে পাকিস্তানের পরমাণু স্থাপনায় পরিকল্পিত হামলা হিসেবে দেখার কোনও ভিত্তি নেই বলেই তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম। অপারেশন সিঁদুরের সামরিক অভিযান নিয়ে আরও তথ্য প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওই সময়ের একাধিক বিতর্কিত ঘটনার ছবিও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে।



