ওয়াশিংটন ও মস্কোর সমীকরণ বদলাচ্ছে? ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপর চাপ বাড়িয়ে রুশ তেলের উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই পদক্ষেপ ঘিরে প্রশ্ন উঠছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কূটনীতিতে নতুন করে বিতর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। একদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কি (Volodymyr Zelenskyy)-র উপর যুদ্ধ থামানোর চাপ বাড়াচ্ছে ওয়াশিংটন, অন্যদিকে রাশিয়ার ডিজ়েল রফতানির উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে কি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) প্রতি নরম মনোভাব দেখাচ্ছেন ট্রাম্প? অসলোর বৈঠক ঘিরে মার্কিন দূতদের ভূমিকা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
জ়েলেনস্কির উপর চাপ, রাশিয়ার জন্য ছাড়: বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে রুশ ডিজ়েল সরবরাহ নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত। রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে ডিজ়েল রফতানির ক্ষেত্রে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে আমেরিকা। ট্রাম্পের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ বাড়লে দাম কমাতে সাহায্য মিলতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের সমর্থক এবং মার্কিন কংগ্রেসের একাংশের প্রশ্ন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ চলাকালীন মস্কোর উপর অর্থনৈতিক চাপ কমানো কতটা যুক্তিসঙ্গত?
রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করার জন্যও কিয়েভের উপর চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, জ়েলেনস্কির বক্তব্য, ইউক্রেনের জ্বালানি পরিকাঠামোয় রুশ হামলা বন্ধ না হলে একতরফাভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই প্রেসিডেন্টের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে আরও তিক্ত হয়েছে। ট্রাম্পের রাশিয়া নীতি এবং ইউক্রেনের উপর চাপ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলেও আপত্তি উঠেছে। রয়টার্সের আরেকটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলেরই একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অসলোর বৈঠকে কী হয়েছিল? ২০ অক্টোবর নরওয়ের রাজধানী অসলোয় জ়েলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ (Steve Witkoff)। ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনার (Jared Kushner) ওই আলোচনায় দূর থেকে যোগ দেন। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরে এবং ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজ়ান্ডার স্টাব।
নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের অনুরোধেই মার্কিন দূতদের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বৈঠকের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও গঠনমূলক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর দফতরের বিবৃতি থেকে এই তথ্য জানা যায়।
তবে বৈঠক ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে, মার্কিন দূতেরা কি জ়েলেনস্কিকে যুদ্ধের শর্ত মেনে নিতে চাপ দিয়েছিলেন? সংবাদমাধ্যমে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে ‘ধমক’ দেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। কিন্তু জ়েলেনস্কিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধমক দেওয়া হয়েছিল, এমন কোনও নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে বিষয়টিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ করার জন্য সমঝোতায় আসা উচিত। জ়েলেনস্কিকে নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য মন্তব্য এবং রাশিয়ার সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে আরও টানাপড়েন তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের তরফে মার্কিন সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করে নেওয়া এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগের পরিষেবা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।
মিডটার্মের ভোটই কি ট্রাম্পের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ? আগামী ৩ নভেম্বর আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই ভোটে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ এবং সেনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই হবে। নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ফল খারাপ হলে ট্রাম্পের প্রশাসনিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম ও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সামরিক সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে দাম বেড়েছে। সেই চাপের মধ্যে রাশিয়ার ডিজ়েল সরবরাহের পথ খোলার সিদ্ধান্তকে জ্বালানির দাম কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছেন ট্রাম্প। কিন্তু সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে রাশিয়া আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে এবং ইউক্রেনের উপর কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
এই নীতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের একাংশও সরব। ১৫ অক্টোবর ১৭ জন ডেমোক্র্যাট ও পাঁচ জন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ট্রাম্পকে রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার আহ্বান জানান। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের একাংশ ইউক্রেনের গোয়েন্দা সহায়তা সীমিত করার সম্ভাবনা নিয়েও আপত্তি তুলেছেন।
পুতিনের সুবিধা, জ়েলেনস্কির উদ্বেগ: ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপে মস্কো সুবিধা পেতে পারে—এমন আশঙ্কা ইউক্রেনের সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে। রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক চাপ কমলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মস্কো কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। পাশাপাশি ইউক্রেনের সামরিক সহায়তা বা গোয়েন্দা তথ্যের জোগানে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে কিয়েভের অবস্থানও দুর্বল হতে পারে।
তবে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পিছনে পুতিনের নির্দেশ কাজ করছে, এমন কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ এবং যুদ্ধের অবসান ঘটানোর যুক্তিই সামনে রেখেছে তাঁর প্রশাসন। কিন্তু নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সব মিলিয়ে, অসলোর বৈঠক, রুশ ডিজ়েল নিয়ে সমঝোতা এবং জ়েলেনস্কির উপর চাপ—তিনটি বিষয়ই এখন ট্রাম্পের রাশিয়া-ইউক্রেন নীতিকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই নীতি ভোটারদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: যুদ্ধ থামানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আর আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব এখন পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।



