তৃণমূল ভাঙনের নেপথ্যে কী কৌশল বিজেপি-র? লোকসভায় ‘অস্তিত্বহীন’ দল, বিধানসভায় ‘আসল তৃণমূল’ কেন?

তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি না করে NCPI-তে যোগ দিলেন কেন? আইনি ঝুঁকি, সাংগঠনিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক কৌশল ঘিরে জোর আলোচনা।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

অর্ক সানা, সম্পাদক(নজরবন্দি.ইন): তৃণমূলের ভাঙন এখন শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়, তা পরিণত হয়েছে সাংবিধানিক, আইনি ও কৌশলগত লড়াইয়ে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— বিধানসভায় বিদ্রোহীরা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করলেও লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদরা কেন একটি প্রায় অচেনা দলের ছাতার তলায় গেলেন? রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এর উত্তর খুঁজতে হলে বিজেপি-র কৌশল, দলত্যাগবিরোধী আইন এবং তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো— তিনটিকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।

লোকসভায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়, সায়নী ঘোষদের নেতৃত্বে বিদ্রোহী সাংসদরা শেষ পর্যন্ত ন্যাশনালিস্ট সিটিজ়েন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগ দিয়েছেন। অথচ বিধানসভায় ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা নিজেদেরই ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে দাবি করে বিরোধী শিবিরে বসেছেন। এই দুই ভিন্ন কৌশলই এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিধানসভার বিদ্রোহের পর যে আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা থেকেই শিক্ষা নিয়েছেন লোকসভার বিদ্রোহীরা। বিধানসভার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় ও নেতৃত্ব নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। সেই পরিস্থিতিতে লোকসভার সাংসদরা তৃণমূলের নাম বা প্রতীকের দাবিতে না গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় বেছে নিয়েছেন।

তৃণমূল ভাঙনের নেপথ্যে কী কৌশল বিজেপি-র? লোকসভায় ‘অস্তিত্বহীন’ দল, বিধানসভায় 'আসল তৃণমূল' কেন?
তৃণমূল ভাঙনের নেপথ্যে কী কৌশল বিজেপি-র? লোকসভায় ‘অস্তিত্বহীন’ দল, বিধানসভায় ‘আসল তৃণমূল’ কেন?

এখানেই উঠে আসছে বিজেপি-র ভূমিকার প্রশ্ন। বিদ্রোহী সাংসদদের একাধিক বৈঠক বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাসভবনে হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই পদক্ষেপ ছিল অনেকটাই হিসাব কষে নেওয়া সিদ্ধান্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিজেপির লক্ষ্য বিদ্রোহীদের সরাসরি দলে টেনে নেওয়া নয়, বরং সংসদে প্রয়োজনের সময়ে তাঁদের সমর্থন নিশ্চিত করা। কারণ, একসঙ্গে এতজন সাংসদকে বিজেপিতে নেওয়া হলে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক আরও বাড়তে পারত। তার বদলে একটি পৃথক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়া অনেক বেশি সুবিধাজনক।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো। দলটির গঠনতন্ত্র চেয়ারপার্সন-কেন্দ্রিক। অর্থাৎ, সাংসদ বা বিধায়কদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই দল, প্রতীক বা তহবিলের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায় না। সেই ক্ষমতা মূলত সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে থাকে। বর্তমানে সেই নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠদের কাছেই রয়েছে।

ফলে লোকসভার বিদ্রোহীরা বুঝেছিলেন, নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করলেও দলীয় প্রতীক বা সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বরং আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি।

এছাড়াও কংগ্রেস-তৃণমূল সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল। যদি ভবিষ্যতে কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্গঠন ঘটত, তাহলে দলত্যাগবিরোধী আইনের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারত। আগেভাগে পৃথক দলের আশ্রয় নেওয়ার ফলে সেই ঝুঁকিও অনেকটাই কমিয়ে ফেলেছেন বিদ্রোহীরা।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, যে NCPI-তে বিদ্রোহীরা যোগ দিয়েছেন, সেই দলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব কার্যত নগণ্য। নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, এটি একটি নিবন্ধিত কিন্তু অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল। জাতীয় রাজনীতিতে যার পরিচিতি প্রায় নেই বললেই চলে। তাই প্রশ্ন উঠছে— দলটি কি শুধুই একটি রাজনৈতিক আশ্রয়, নাকি বৃহত্তর কৌশলের অংশ?

এই মুহূর্তে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে, লোকসভা ও বিধানসভার বিদ্রোহ এক সূত্রে গাঁথা হলেও তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য এক নয়। বিধানসভায় লড়াই ছিল তৃণমূলের পরিচয়কে কেন্দ্র করে, আর লোকসভায় অগ্রাধিকার পেয়েছে আইনি নিরাপত্তা ও সংসদীয় সমীকরণ। সেই কারণেই ‘আসল তৃণমূল’-এর দাবি ছেড়ে প্রায় অচেনা একটি দলের পতাকার নিচে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদ্রোহী সাংসদরা।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

বিজ্ঞাপন

আরও খবর