২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের লড়াই কার্যত শুরু করে দিল তৃণমূল কংগ্রেস। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের জনসভা থেকে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করলেন—২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে অন্তত একটি আসন বেশি জিতবে তৃণমূল। অর্থাৎ, ২৯৪ আসনের বিধানসভায় লক্ষ্যমাত্রা ন্যূনতম ২১৪ আসন। এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই নিজেকে সরাসরি ভোটযুদ্ধের ‘সেনাপতি’ হিসেবে তুলে ধরলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ।
নতুন বছরের শুরুতেই এই সভাকে ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার হিসেবে ধরছে তৃণমূল শিবির। অভিষেকের বক্তব্যে স্পষ্ট—এবার আর শুধু জয়ের কথা নয়, জয়ের ব্যবধান এবং রাজনৈতিক বার্তা—দুইই গুরুত্বপূর্ণ।
অভিষেক স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ২১৪টি আসন (পরবর্তী উপনির্বাচন ও দলবদলের পরে সংখ্যাটি বেড়ে বর্তমানে ২২৬)। তাঁর কথায়, “আমি বাংলার মানুষকে কথা দিয়েছিলাম—২০২৬ সালে তৃণমূলের আসন সংখ্যা এবং ভোটের শতাংশ, দুটোই বাড়বে। একটা হলেও আমাদের আসন বাড়বেই।”

এই আত্মবিশ্বাসের পিছনে অতীতের নজির তুলে ধরেন তৃণমূলের এই নেতাই। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগেও তিনি জানিয়েছিলেন, ২০১৯ সালের তুলনায় অন্তত একটি আসন বেশি পাবে তৃণমূল। বাস্তবে ২০১৯ সালে ২২টি আসনের জায়গায় ২০২৪-এ দল পায় ২৯টি আসন। সেই অভিজ্ঞতাকেই সামনে রেখে ২০২৬ নিয়ে ফের একই ভবিষ্যদ্বাণী।
কেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকেই শুরু?
দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে নিজের ‘কর্মভূমি’ বলে উল্লেখ করে অভিষেক জানান, তিনি চান অতিরিক্ত সেই একটি আসন এই জেলা থেকেই আসুক। মঞ্চেই বলেন, “আমার জন্মভূমি কালীঘাট, কিন্তু কর্মভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা। এই জেলার মানুষই আমার শক্তি।” বক্তৃতার শেষে মঞ্চে হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে জনতার আশীর্বাদ নেন তিনি—যা রাজনৈতিক বার্তায় আবেগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা বরাবরই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি হলেও ভাঙড়ে ২০২১ সালে জয় আসেনি। সেই ‘খামতি’ এবার পূরণ করাই লক্ষ্য। অভিষেক স্পষ্টভাবে বলেন, “এবার ভাঙড়ও জিততে হবে। এই জেলায় ৩১-এর মধ্যে ৩১ আসন চাই। প্রতিটি আসনে জয়ের ব্যবধান ৫০ হাজারের কম হলে চলবে না।”
ইতিহাস ও রাজনৈতিক বার্তা
দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে অভিষেক বলেন, ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট থেকেই এই জেলা পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। সেই ফলের ধারাবাহিকতায় ২০০৯ লোকসভা এবং ২০১১ বিধানসভায় বাম শাসনের পতন ঘটে। তাঁর দাবি, “বাংলার রাজনৈতিক মোড় ঘোরাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভূমিকা বারবার প্রমাণিত।”

এসআইআর বনাম ‘জনতার এফআইআর’
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়েও এ দিন তীব্র আক্রমণ করেন অভিষেক। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে নিশানা করে বলেন, “ওরা এনেছে এসআইআর। আর বাংলার মানুষ ভোটের মাধ্যমে ওদের বিরুদ্ধে এফআইআর করবে।” সভামঞ্চে কয়েকজন ভোটারকে হাজির করে দাবি করেন, তাঁদের মৃত দেখানো হয়েছিল তালিকায়। সেই ছবি দেখিয়ে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র কটাক্ষ করেন তিনি।
অভিষেকের অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ার আতঙ্কে গত কয়েক মাসে বহু মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন, অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর সাফ কথা, “শত্রুতা থাকলে আমাদের নোটিস দিন। সাধারণ মানুষকে কেন টার্গেট করা হচ্ছে?”
বিজেপির বিরুদ্ধে একাধিক তোপ
এসআইআর থেকে শুরু করে ধর্ম, সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান—সব ক্ষেত্রেই বিজেপিকে আক্রমণ শানান তৃণমূলের ‘সেনাপতি’। গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে চিকেন প্যাটিস বিক্রিকে কেন্দ্র করে মারধরের ঘটনা নিয়ে বলেন, “গীতাতেই বলা আছে—সব জীবের মধ্যেই ঈশ্বর বিরাজমান।” জল, বায়ু দূষণ এবং চাকরির প্রশ্ন তুলে বিজেপিকে ‘ব্যর্থ সরকার’ বলে কটাক্ষ করেন অভিষেক।
পাশাপাশি বিজেপিকে ‘বাংলা-বিরোধী’ তকমা দিয়ে বলেন, “যে দল নিজের বুথ সভাপতিকে রক্ষা করতে পারে না, তারা বাংলার মানুষকে কীভাবে রক্ষা করবে?” ২০২৬-এর স্লোগান হিসেবেও মঞ্চ থেকে ঘোষণা করেন—
‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’।
সব মিলিয়ে, বারুইপুরের এই সভা শুধু একটি জনসভা নয়—২০২৬-এর লড়াইয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক রণকৌশলের প্রকাশ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।



