দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে ঘিরে সংসদীয় রাজনীতিতে বড়সড় সংঘাতের পথে হাঁটতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার-এর বিরুদ্ধে সংসদে ইমপিচমেন্ট (বরখাস্ত) প্রস্তাব আনার প্রস্তুতি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দলের সাংসদদের। মঙ্গলবার বিকেলে লোকসভা ও রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে বসে এই বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়—এমনটাই দলীয় সূত্রের খবর।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার যেহেতু একটি সাংবিধানিক পদ, তাই তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনতে গেলে অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। বর্তমানে তৃণমূলের মোট সাংসদ সংখ্যা ৪১ (মৌসম বেনজির নুর ইস্তফার পরে)। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যায় পৌঁছতে সমমনোভাবাপন্ন বিরোধী দলগুলির দ্বারস্থ হওয়াই একমাত্র পথ। আর এখানেই তৃণমূলের কৌশল স্পষ্ট—বিজেপি-বিরোধী সর্বভারতীয় মঞ্চের শরিকদের কাছ থেকেই স্বাক্ষর সংগ্রহের চেষ্টা।
দলীয় সূত্রের ব্যাখ্যা, ইন্ডিয়া জোট-ভুক্ত দলগুলির সাংসদরা যদি এই প্রস্তাবে সই করেন, তা হলে জাতীয় স্তরে বিজেপি-বিরোধী রাজনীতিতে তৃণমূলের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে। আবার কেউ সই না করলে, সংশ্লিষ্ট দলগুলির বিজেপি-বিরোধিতার ‘সদিচ্ছা’ নিয়েই প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হবে—এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক লাভের অঙ্কই কষছে শাসক দল।
সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল আশাবাদী কয়েকটি দলের ভূমিকা নিয়ে। দলের সঙ্গে অখিলেশ যাদব-এর সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে সমাজবাদী পার্টির সাংসদদের সমর্থন মিলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি কলকাতায় এসে নবান্নে মমতার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক করেছিলেন অখিলেশ। একই ভাবে বিহারের প্রধান বিরোধী দল RJD এবং তামিলনাড়ুর শাসকদল DMK-এর সঙ্গেও তৃণমূলের সুসম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে এম কে স্ট্যালিন-এর সঙ্গে মমতার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সখ্যের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন দলের নেতারা।
তৃণমূলের অন্দরমহলে মনে করা হচ্ছে, ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব আনার প্রক্রিয়াই সংসদীয় রাজনীতিতে বিজেপির অবস্থান ‘উন্মোচিত’ করতে সাহায্য করবে। এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলগুলির আপত্তি থাকলেও, তৃণমূলের মতো করে কেউই বিষয়টিকে উচ্চগ্রামে তোলে নি—এমনটাই দলের বক্তব্য। নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে এসআইআর-এ ‘আক্রান্ত’দের নিয়ে পৌঁছনোর ক্ষেত্রেও তৃণমূলই সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ভূমিকা নিয়েছে।
মমতা অবশ্য মঙ্গলবার এই প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য করেননি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, বাকি বিরোধী দলগুলির সমর্থন নিশ্চিত করতেই সচেতন ভাবেই এই বিষয়ে সংযত ছিলেন তিনি। লক্ষ্য একটাই—জ্ঞানেশ কুমারের বিরোধিতাকে জাতীয় স্তরে আরও জোরালো করা।
তৃণমূল ভাল করেই জানে, BJP-নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র সংসদীয় শক্তির কারণে এই প্রস্তাব পাশ হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই। তবু সংসদীয় গণতন্ত্রের বুনিয়াদি নিয়ম মেনেই সেই পথে এগোতে চায় তারা। কংগ্রেস-সহ একাধিক বিরোধী দল ইতিমধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে ‘বিজেপির শাখা সংগঠন’ বলে কটাক্ষ করেছে। সেই প্রেক্ষিতেই তৃণমূলের বিশ্বাস—ইমপিচমেন্ট প্রস্তাবে বিরোধী শিবিরের বিস্তৃত সমর্থন পাওয়া সম্ভব।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, জাতীয় রাজনীতিতে শেষবার ইমপিচমেন্ট প্রস্তাব নিয়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল গত বছরের জুলাইয়ে, যখন ইলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে রাজ্যসভায় প্রস্তাব আনা হয়েছিল। তৎকালীন রাজ্যসভার চেয়ারম্যান জগদীপ ধনখড়ের ইস্তফার পরে সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। জ্ঞানেশ কুমারের ক্ষেত্রে তৃণমূল কতদূর এগোতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে জাতীয় রাজনীতি।



