নজরবন্দি ব্যুরো: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision)-কে ঘিরে ফের বড়সড় সংখ্যা সামনে এল। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত খসড়া তালিকার হিসাবে, এখনও পর্যন্ত ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১ কোটি ৫৮ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। তবে এই সংখ্যা চূড়ান্ত নয়—আরও কয়েকটি রাজ্যের খসড়া তালিকা প্রকাশ বাকি থাকায় মোট সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিহার দিয়ে শুরু হওয়া SIR-এর পরবর্তী ধাপে দেশের একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকা যাচাই চলছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত বর্তমান সূচি অনুযায়ী, এই পর্যায়ে বিভিন্ন রাজ্যে খসড়া তালিকা প্রকাশ, দাবি-আপত্তি গ্রহণ এবং পরে শুনানি ও যাচাইয়ের জন্য আলাদা সময়সীমা রাখা হয়েছে।
প্রকাশিত ১২টি খসড়া তালিকায় মোট ভোটার ছিলেন ১৩ কোটি ৭৭ লক্ষ ২৭ হাজার ৮০৭ জন। কমিশনের হিসাবে, মৃত, অন্যত্র চলে যাওয়া, অনুপস্থিত বা অন্যান্য কারণে এই তালিকাগুলি থেকে এখনও পর্যন্ত ১ কোটি ৫৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ৮৩৪ জনের নাম বাদ পড়েছে। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট তালিকাগুলির মোট ভোটারের প্রায় ১১.৫ শতাংশের নাম এই পর্যায়ে বাদ গিয়েছে।
তবে এই বাদ পড়া নামকে সরাসরি ‘ভুয়ো ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। SIR-এর উদ্দেশ্যই হল ভোটার তালিকার তথ্য যাচাই করে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত বা একাধিক জায়গায় থাকা নাম চিহ্নিত করা এবং যোগ্য ভোটারের নাম নিশ্চিত করা। কমিশনও জানিয়েছে, দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকবে এবং যাচাইয়ের পরেই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে।
প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, নাম বাদ পড়ার সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে অন্ধ্রপ্রদেশ, সেখানে প্রায় ৪৪ লক্ষ ৮৯ হাজার নাম বাদ পড়েছে। এরপর রয়েছে হরিয়ানা, প্রায় ৩৩ লক্ষ ৮৩ হাজার এবং ওড়িশা, প্রায় ২০ লক্ষ ১২ হাজার। অন্য দিকে, সবচেয়ে কম নাম বাদ পড়ার হিসাব সিকিমে—প্রায় ৩৭ হাজার ৭২৪।
তবে সব রাজ্যের খসড়া তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। কয়েকটি রাজ্যে যাচাই ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জন্য সময় বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান নথিতেও বিভিন্ন রাজ্যের SIR-এর জন্য আলাদা আলাদা খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে।
বিশেষ করে মহারাষ্ট্রে SIR-এর সময়সীমা সম্প্রতি বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেখানে এনিউমারেশন ফর্ম জমা ও বাড়ি-বাড়ি যাচাইয়ের সময় ১৭ অগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে ওই রাজ্যের পরবর্তী তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়াতেও তার প্রভাব পড়ছে।
SIR-এর এই পর্বে শুধু বড় রাজ্যই নয়, উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলও রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সূচিতে ওড়িশা, মিজোরাম, সিকিম, মণিপুর, দাদরা ও নগর হাভেলি এবং দমন ও দিউ, উত্তরাখণ্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, চণ্ডীগড়, তেলঙ্গানা, পঞ্জাব, কর্নাটক, মেঘালয়, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, দিল্লি, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরার নাম রয়েছে।
এই তালিকা সংশোধন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও নতুন নয়। পশ্চিমবঙ্গে SIR চলাকালীন তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) তরফে অভিযোগ উঠেছিল, বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো করে ভোটার তালিকা সংশোধনের চেষ্টা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ছিল, যোগ্য ভোটারের নাম বাদ না দিয়ে এবং অযোগ্য নাম ঠেকিয়েই ভোটার তালিকা আরও নির্ভুল করাই এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।
পশ্চিমবঙ্গের SIR-কে ঘিরে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আদালত পর্যন্ত গড়ায়। সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India)-এ একাধিক শুনানি হয়। ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পরও যেসব ভোটারের নাম নিয়ে যাচাই বা নিষ্পত্তির প্রয়োজন রয়েছে, তাঁদের বিষয়টি মেটাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে SIR-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হল দাবি, আপত্তি এবং শুনানি। অর্থাৎ খসড়া তালিকা থেকে নাম বাদ পড়লেই বিষয়টি শেষ হয়ে যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ভোটার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি জানাতে পারবেন এবং নির্বাচন কর্তৃপক্ষ সেই দাবি ও নথি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে।
ফলে এখনই SIR-এ বাদ পড়া নামের সংখ্যাকে চূড়ান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আরও রাজ্যের খসড়া তালিকা প্রকাশ, দাবি-আপত্তি এবং শুনানি শেষ হওয়ার পরই ছবিটা পরিষ্কার হবে। তবে ইতিমধ্যেই দেড় কোটির বেশি নাম বাদ পড়ার পরিসংখ্যান ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক যে আরও বাড়াবে, তা বলাই যায়।



