নজরবন্দি ব্যুরোঃ প্রয়াত বিখ্যাত সাংবাদিক ও বাংলাদেশের বন্ধু সাইমন ড্রিং। প্রয়াত হলেন বিখ্যাত সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। বাংলাদেশে মুক্তি যুদ্ধের সময় যেকজন বিদেশী সাংবাদিক বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায় তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাইমন ড্রিং। গত শুক্রবার তলপেটের সার্জারি করাতে গিয়ে প্রয়াত হন এই বিখ্যাত সাংবাদিক।
আরও পড়ুনঃ ২১ এর ঝক্কি সামলে রাতেই দিল্লি যাচ্ছেন অভিষেক, বাকিদের দেবেন মমতা-বার্তা
তিনি দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফের রিপোর্টার ছিলেন। বাংলাদেশ যখন চরম উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে ঠিক তখন তিনি কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে সাংবাদিকতা করছেন। হঠাৎ লন্ডনের হেড কোয়ার্টার থেকে তাঁকে জানানো হয়, পুর্ব পাকিস্থানের রাজনৈতিক অবস্থা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে, কিছুদিনের মধ্যে কিছু একটা হতে পারে। তাই তাঁকে যেতে হবে ঢাকা। সাইমন দির্ঘদিন কাজ করেছেন লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম অঞ্চলে। পাকিস্থান সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। এরপর রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের জনসভা কাভার করেন তিনি। সপ্তাখানেকের জন্য এসে আর ফিরে যেতে পারলেন না তিনি।

এরপর আস্তে আস্তে পাকিস্থানের রাজনীতি, পুর্ব পাকিস্থানে মানুষের আন্দোলন সম্পর্কে জানার আগ্রহ বাড়লো তাঁর। আওয়ামী লীগ সহ শেখ মুজিবরের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। প্রতিদিন তিনি বাংলাদেশের খবর পাঠাতেন লন্ডনে। এরপর ২৫শে মার্চ রাতে সাইমন ছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। পাকিস্তানের সামরিক আইন উপেক্ষা করে ঝুঁকি নিয়ে ২৭শে মার্চ “ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান” শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পাঠিয়েছিলেন বিখ্যাত ডেইলি টেলিগ্রাফে। যা প্রকাশিত হয় ৩০ মার্চ। যে রিপোর্ট সারা বিশ্বে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে সে রিপোর্টের আলোকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশাল এক জনমত সৃষ্টি করে পৃথিবীজুড়ে। ঠিক ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করার আগে ঢাকায় থাকা প্রায় দু’শো বিদেশি সাংবাদিককে আটকে ফেলে হোটেলে।
প্রয়াত বিখ্যাত সাংবাদিক ও বাংলাদেশের বন্ধু সাইমন ড্রিং-এর লেখা মুক্তিযুদ্ধের রিপোর্ট এক জনমত সৃষ্টি করে পৃথিবীজুড়ে।
সকল সাংবাদিককে হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়, যাতে গণহত্যার কোন সংবাদ বিশ্ব গণমাধ্যম সংগ্রহ করতে না পারে। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংও। পাকিস্তানী সামরিক আইন অমান্য করে সাইমন ড্রিং লুকিয়ে থাকলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে্ল। হোটেলের লবি, ছাদ, বার, কিচেন প্রভৃতি স্থানে ঘুরে ঘুরে স্বচক্ষে দেখেন গণহত্যার বাস্তব চিত্র। এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়ি প্রভৃতি স্থান প্রত্যক্ষভাবে ঘুরে দেখেন। তারপর মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে ব্রিটিশ হাই কমিশনের সহায়তায় ঢাকা ছাড়েন সাইমন। শুধু তাই নয় বিশ্বের সর্ববৃহত্ দাতব্য তহবিল ‘দ্য রেস এসেইন্ট টাইম’ তাঁরই গড়া। যেখানে ১৬০টি দেশের সাড়ে ৫ কোটিরও বেশী লোক স্বেচ্ছায় অর্থ দিয়েছেন। “স্পোর্ট এইড” নামের আরকটি তহবিল গড়েন তিনি।
প্রয়াত বিখ্যাত সাংবাদিক ও বাংলাদেশের বন্ধু সাইমন ড্রিং। বিশ্বব্যাপী ১২০টি দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ এ তহবিলে দান করেছিল। যা ব্যয় করা হয়েছিলো আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন স্টেশন একুশে টেলিভিশনের যাত্রা শুরু করার সময় সাইমন ড্রিংয়ের ভূমিকা ছিল ভিষন গুরুত্বপূর্ণ। তাই বলা হয়, তাঁর হাত ধরেই এ দেশে টেলিভিশন সাংবাদিকতার নতুন মাত্রা পেয়েছিল। এজন্য তাকে বলা হয়, বাংলাদেশে ব্রডকাস্ট সাংবাদিকতার জনক। ২০০২ সালে একুশে টেলিভিশন সরকার কথিত কর্তৃপক্ষ সম্প্রচার আইন লঙ্ঘন করেন। এরপর সরকার তাঁর ভিসা বাতিল করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হন।



