‘তপনকে জেলে দেখতে চাই’, ছোট আঙারিয়া থেকে নন্দীগ্রাম— বাম আমলের পুরনো মামলা খোলার হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর

গড়বেতার ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ সভা থেকে ছোট আঙারিয়া, নন্দীগ্রাম ও কেশপুরের পুরনো মামলার ফাইল ফের খতিয়ে দেখার হুঁশিয়ারি দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তপন ঘোষ ও সুশান্ত ঘোষকে জেলে দেখতে চাওয়ার মন্তব্যে পাল্টা সরব সিপিএম।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতায় বিজেপির ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ সভা থেকে বাম আমলের রাজনৈতিক হিংসার ঘটনাগুলি নিয়ে সরব হলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবারের সভায় ছোট আঙারিয়া, নন্দীগ্রাম ও কেশপুরের প্রসঙ্গ তুলে পুরনো মামলাগুলি নতুন করে খতিয়ে দেখার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। সিপিএমের প্রাক্তন নেতা তপন ঘোষ ও সুশান্ত ঘোষকে নিশানা করে পুলিশ সুপারের উদ্দেশে তাঁদের জেলে দেখতে চাওয়ার কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী। পাল্টা, ছোট আঙারিয়া মামলার বিচার ও আদালতের নির্দেশের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন তুলেছেন সিপিএম নেতা সুশান্ত ঘোষ।

গড়বেতার সভায় শুভেন্দুর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বামফ্রন্ট আমলে পশ্চিম মেদিনীপুর ও পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনৈতিক হিংসার একাধিক ঘটনা। ছোট আঙারিয়া থেকে নন্দীগ্রাম—অতীতের সেই ঘটনাগুলির তদন্ত ও মামলার ফাইল ফের খোলার কথা বলেন তিনি। তাঁর দাবি, গড়বেতার সিপিএম পার্টি অফিস থেকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে কারা নন্দীগ্রামে গিয়েছিল, তা খুঁজে বের করা হবে। সভামঞ্চ থেকেই ঘোষণা করেন, “সব কেস রিওপেন করব। একটাকেও ছাড়ব না।”

ছোট আঙারিয়া ও নন্দীগ্রাম পর্বে আলোচনায় উঠে আসা তপন ঘোষ ও শুকুর আলির নামও করেন মুখ্যমন্ত্রী। একসময় গড়বেতা এলাকায় প্রভাবশালী সিপিএম নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তপন। শুভেন্দুর অভিযোগ, অতীতে তাঁকে এলাকায় ঢুকতে বাধা দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, হুমকির পরেও তিন দিনের মধ্যে সেখানে সভা করেছিলেন। তার পরেই মঞ্চ থেকে প্রশ্ন করেন, “তপন কোথায়?” পশ্চিম মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানার উদ্দেশে তাঁর বার্তা, তপন ঘোষকে জেলে দেখতে চান তিনি।

শুধু তপন নন, সিপিএমের প্রাক্তন বিধায়ক সুশান্ত ঘোষকেও আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁকে কঙ্কাল-কাণ্ডের প্রসঙ্গে নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী জানতে চান, তিনি কোথায়। পুলিশ সুপারের উদ্দেশে সুশান্ত ঘোষকেও জেলে দেখতে চাওয়ার কথা বলেন তিনি। তবে সভায় মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি হিসেবেই উঠে এসেছে; সংশ্লিষ্ট মামলাগুলির বর্তমান আইনি অবস্থার সঙ্গে তার পার্থক্য রয়েছে।

ছোট আঙারিয়া কাণ্ডের সূত্র ২০০১ সালের ৪ জানুয়ারি। গড়বেতার ছোট আঙারিয়া গ্রামে তৃণমূল কর্মী বক্তার মণ্ডলের বাড়িতে আগুন লাগানোর অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় পাঁচ জনের মৃত্যুর অভিযোগ সামনে এসেছিল। মামলার তদন্তে সিবিআই যুক্ত হয়। ২০০৯ সালের মে মাসে পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি আদালত প্রমাণের অভাবে আট জন সিপিএম কর্মীকে বেকসুর খালাস করে। ফলে এই মামলার ফাইল নতুন করে খোলার হুঁশিয়ারির পাশাপাশি আগের বিচারপ্রক্রিয়া ও আদালতের রায়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শুভেন্দুর বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন সুশান্ত ঘোষ। তাঁর দাবি, ছোট আঙারিয়া মামলার বিচার ইতিমধ্যেই হয়েছে। নতুন করে ফাইল খোলার কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী কী করতে চাইছেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। সুশান্তের বক্তব্য, এই সংক্রান্ত একটি মামলা দীর্ঘদিন ধরে কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court) বিচারাধীন রয়েছে এবং সেখানে স্থগিতাদেশ রয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার আইনি তাৎপর্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

নন্দীগ্রামের প্রসঙ্গেও পুরনো রাজনৈতিক সংঘাতের স্মৃতি উস্কে দেন শুভেন্দু। ২০০৭ সালে জমি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম। ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা রাজ্য রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। সেই বছরের ১০ নভেম্বর সিপিএমের ‘অপারেশন সূর্যোদয়’ ঘিরেও নতুন করে হিংসা ও রাজনৈতিক সংঘাতের অভিযোগ ওঠে। শনিবারের সভায় শুভেন্দু মূলত ১০ নভেম্বরের অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে গড়বেতা থেকে অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই সংশ্লিষ্ট মামলাগুলি ফের খতিয়ে দেখার কথা বলেন তিনি।

তৃণমূল ও সিপিএমকে একই রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করিয়েও আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, “এখন যাহা তৃণমূল, তাহাই সিপিএম।” দুই দল একসঙ্গে রাজ্যে নৈরাজ্য তৈরি করতে চাইছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কেশপুরের অতীত রাজনৈতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু বলেন, কোনও ঘটনাই তাঁর মনে থেকে মুছে যায়নি। এবার সেই সব ঘটনার হিসাব নেওয়ার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন।

শুভেন্দুর হুঁশিয়ারির পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীও। তাঁর বক্তব্য, যদি সব পুরনো ফাইল খোলার কথা বলা হয়, তা হলে কিষেণজির মৃত্যুর ঘটনাটিও খতিয়ে দেখা হোক। একই সঙ্গে অতীতে শুভেন্দুর রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রীকে পাল্টা আক্রমণ করেন তিনি।

অতীতের রাজনৈতিক হিংসার ঘটনা নিয়ে শনিবারের সভায় একাধিক বার্তা দিয়েছেন শুভেন্দু। তবে পুরনো মামলা নতুন করে খতিয়ে দেখা বা তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি, আদালতের নির্দেশ এবং আইনি প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত নির্ণায়ক হবে। রাজনৈতিক মঞ্চের হুঁশিয়ারি আর বাস্তবে কোনও মামলা পুনরায় চালু হওয়ার প্রক্রিয়া এক বিষয় নয়।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

সদ্য প্রকাশিত

এই ক্যাটেগরির আরও খবর