কলকাতা: বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বদলি সংক্রান্ত বিল নিয়ে উত্তপ্ত বিধানসভা। আর সেই বিতর্কেই বামপন্থী অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রিক রাজনীতিকে তীব্র আক্রমণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। মার্ক্স, লেনিন, চে গুয়েভারা ও সমাজতন্ত্র নিয়ে যাঁদের ‘এত জ্ঞান’, তাঁদের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির বদলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার (West Bengal Legislative Assembly) বিশেষ অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সংশোধনী বিল নিয়ে আলোচনা চলছিল। বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শুভেন্দুর বক্তব্যের বড় অংশ জুড়ে ছিল শিক্ষক বদলি, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ।
শুভেন্দুর বক্তব্য, রাজ্যের পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে নতুন তৈরি হওয়া বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও পরিকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। তাই অভিজ্ঞদের সেখানে পাঠিয়ে শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মধ্যে আপত্তির কারণ দেখছেন না তিনি।
বামপন্থী মনোভাবাপন্ন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিশানা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, মার্ক্স, লেনিন, চে গুয়েভারা, সমাজতন্ত্র কিংবা শ্রমিক-কৃষকের অধিকার নিয়ে যাঁরা নিয়মিত আলোচনা করেন, তাঁদের সেই জ্ঞান নতুন ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কাজে লাগানো উচিত।
সেখানেই আসে তাঁর বহুচর্চিত ‘লাল ঝান্ডা’ প্রসঙ্গ। শুভেন্দুর বক্তব্যের সারমর্ম, প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে রাজনৈতিক স্লোগান ও কর্মসূচিতে সময় না দিয়ে যেখানে শিক্ষক বা কর্মীর ঘাটতি রয়েছে, সেখানে গিয়ে লাইব্রেরি ও ল্যাবরেটরি তৈরির মতো কাজে সহযোগিতা করা হোক।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University)-এর শিক্ষক সংগঠন ও বামপন্থী শিক্ষক রাজনীতি নিয়েও এদিন সরাসরি আক্রমণ করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি ‘নামধারী’ শিক্ষক সংগঠনের অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জানান, সেই ইতিহাস সরকারের অজানা নয়।
শিক্ষক বদলি নিয়ে সরকারের যুক্তি, শুধু কর্মী পুনর্বিন্যাস নয়, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে শক্তিশালী করাও এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য। সরকারের দাবি, অভিজ্ঞ শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগানো গেলে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা সম্ভব।
যদিও প্রস্তাবিত বদলি ব্যবস্থা নিয়ে আপত্তি রয়েছে অধ্যাপক সংগঠনগুলির একাংশের। তাঁদের বক্তব্য, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদের বদলির ক্ষমতা প্রয়োগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বা প্রশাসনিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ, সরকারের ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস’-এর যুক্তির বিপরীতে শিক্ষক মহলের একাংশের মূল উদ্বেগ বিশ্ববিদ্যালয়ের autonomy ঘিরে।
বিলের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েও বিধানসভায় সওয়াল করেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, শিক্ষা সংবিধানের সমবর্তী তালিকায় থাকায় এই বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাজ্যের রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষক বদলি সংক্রান্ত অনুরূপ ব্যবস্থার নজির রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়েও এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল কঠোর। তাঁর পরামর্শ, ক্যাম্পাসের বাইরে প্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে মিছিল করা উচিত এবং সেই কর্মসূচিতে জাতীয় পতাকা রাখার কথাও বলেন তিনি।
এদিনের বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতেও বামপন্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকে নিশানা করেন শুভেন্দু। ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি’ ধরনের স্লোগানের প্রসঙ্গ তুলে কড়া আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন তিনি। পহেলগাম হামলা বা অপারেশন সিঁদুরের মতো ঘটনার পর ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ স্লোগান তোলা নিয়েও আপত্তি জানান মুখ্যমন্ত্রী।
তবে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, প্রতিবাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে সরকারের প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক পরিধি নিয়ে বিতর্ক থাকছেই। ফলে এদিনের বিধানসভা বিতর্কে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি রাজ্যের রাজনৈতিক আদর্শের সংঘাতও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।



