গালওয়ান সংঘর্ষের পর এই প্রথম ভারতে আসতে চলেছেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে বসছে ব্রিকস (BRICS) সম্মেলন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, সম্মেলনের প্রথম দিন, শনিবার ১২ সেপ্টেম্বরই সেখানে যোগ দিতে পারেন চিনা প্রেসিডেন্ট। সেই সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সঙ্গে তাঁর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
তবে জিনপিংয়ের ভারত সফর বা মোদীর সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে এখনও কেন্দ্রের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও ঘোষণা করা হয়নি। বেজিংয়ের তরফেও এ বিষয়ে এখনও কোনও সরকারি বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত চিনা প্রেসিডেন্টের সফরসূচি কী হবে, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে জল্পনা অব্যাহত।
২০১৯ সালে শেষ বার ভারতে এসেছিলেন জিনপিং। তার পরের বছরই পূর্ব লাদাখের গালওয়ানে ভারতীয় সেনার সঙ্গে চিনা বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় জওয়ান নিহত হন। চিনও সরকারি ভাবে তাদের বাহিনীর চার জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছিল।
গালওয়ানের পর থেকেই ভারত-চিন সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপড়েন শুরু হয়। সীমান্তে সেনা মোতায়েন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (LAC) ঘিরে বিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের জেরে দুই দেশের সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত তলানিতে ছিল। সেই পরিস্থিতির পর জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফর তাই বিশেষ কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে।
যদিও গত কয়েক বছরে ভারত ও চিনের মধ্যে একাধিক কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। ধীরে ধীরে কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও দেখা গিয়েছে। গত অগস্টে সীমান্ত সংক্রান্ত বৈঠকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval) এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই (Wang Yi) অংশ নেন।
সূত্রের খবর, ওই বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিতর্কিত এলাকাগুলিতে সীমান্ত চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়েও আলোচনা হয়। ফলে দু’দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক পথ তৈরি হচ্ছে বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, শুধু সীমান্ত সমস্যার সমাধান নয়, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও ফের জোরদার করতে চাইছে বেজিং। একই সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা থাকলেও নয়াদিল্লির সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগের রাস্তা খোলা রাখতে চাইছে চিন।
তবে ভারতের কাছে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও সীমান্ত নিরাপত্তা। নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অবস্থান, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে ভারত-চিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পুরোপুরি স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। ফলে অর্থনীতি, বাণিজ্য বা বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পাশাপাশি সীমান্ত পরিস্থিতিই আলোচনার কেন্দ্রে থাকার সম্ভাবনা বেশি।
এর মধ্যেই গত বছর জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার পর ভারতীয় সেনার ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষের সময় চিনের অবস্থানও নয়াদিল্লির অস্বস্তির কারণ হয়ে রয়েছে। ওই সময়ে পাকিস্তানের প্রতি বেজিংয়ের প্রকাশ্য সমর্থন ভারত-চিন সম্পর্কে অবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছিল বলে মনে করেন কূটনৈতিক মহলের একাংশ।
এই পরিস্থিতিতে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে বার্তা দিতে পারেন, তার মূল সুর হতে পারে—ভারত বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। কিন্তু একই সঙ্গে গালওয়ানের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই হবে নয়াদিল্লির কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।



