CEC নিয়োগ আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে ফের ধাক্কা! জ্ঞানেশ মামলার মাঝেই বিচারপতির মত প্রত্যাহারের আর্জি

CEC ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিভক্ত রায়ের পর বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার মত প্রত্যাহারের আবেদন খতিয়ে দেখবে আদালত।

নজরবন্দি ডিজিটাল ডেস্ক

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চলা মামলায় নতুন মোড়। গত মাসের বিভক্ত রায়ের পর এবার বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার মতামত প্রত্যাহারের আর্জি খতিয়ে দেখবে শীর্ষ আদালত।

মামলাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ, ওই আবেদনেই বিচারপতি শর্মার ছেলে সিদ্ধার্থ শর্মার নির্বাচন কমিশনের (ECI) হয়ে আইনজীবী হিসেবে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনকারীর দাবি, এই সম্পর্কের কথা আগে জানানো হয়নি এবং তা জানলে বিচারপতির বেঞ্চে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হত।

এর আগে ২৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি সতীশ চন্দ্র শর্মার বেঞ্চে CEC ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন নিয়ে বিভক্ত মত তৈরি হয়েছিল। মূল প্রশ্ন ছিল, এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে দায়ের হওয়া মামলাগুলি পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো প্রয়োজন কি না।

বিচারপতি দত্ত বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর প্রয়োজন নেই বলে মত দেন। অন্যদিকে বিচারপতি শর্মা মনে করেন, বিষয়টিতে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে এবং তা পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে বিবেচিত হওয়া উচিত। দুই বিচারপতির মতভেদের পর মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

এবার সেই বিভক্ত রায়েরই একটি অংশ প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে। নতুন আবেদনে বিচারপতি শর্মার ছেলে সিদ্ধার্থ শর্মার পেশাগত ভূমিকার প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়েছে। তিনি ২০২৪ সালের জুলাই থেকে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্টে (Madhya Pradesh High Court) নির্বাচন কমিশনের স্ট্যান্ডিং কাউন্সেল হিসেবে যুক্ত রয়েছেন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আবেদনকারীদের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি মামলা চলার সময় বিচারপতির পরিবারের সদস্যের নির্বাচন কমিশনের হয়ে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত থাকার বিষয়টি প্রকাশ করা উচিত ছিল। তবে এটি আবেদনকারীদের অভিযোগ ও আইনি যুক্তি—এখনও আদালত এই অভিযোগকে সত্য বা বিচারপতির পক্ষপাতের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি।

এই জায়গাটিই মামলার আইনি গুরুত্ব বাড়িয়েছে। আবেদনকারীরা শুধু ২০২৩ সালের আইনটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না, বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং বিচারিক শিষ্টাচার (judicial propriety)-এর প্রশ্নও তুলেছেন। তাঁদের যুক্তি, প্রকৃত পক্ষপাত প্রমাণিত না হলেও কোনও বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়ে যুক্তিসঙ্গত আশঙ্কা তৈরি হলে সেটিও বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

তবে এই আবেদনের অর্থ এই নয় যে ২০২৩ সালের CEC নিয়োগ আইন আপাতত বাতিল হয়ে গিয়েছে। আইনটি এখনও কার্যকর রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূল সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ এবং বৃহত্তর বেঞ্চে তা পাঠানোর প্রশ্ন—দুটিই আলাদা আইনি স্তরে রয়েছে।

এই ২০২৩ সালের আইনই নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য তিন সদস্যের একটি বাছাই কমিটি তৈরি করেছে। কমিটিতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। আগের ব্যবস্থার তুলনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল, বাছাই কমিটি থেকে ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI)-কে বাদ দেওয়া।

এর আগে Anoop Baranwal vs Union of India মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, সংসদ এ বিষয়ে আইন না করা পর্যন্ত CEC ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কমিটি কাজ করবে। পরে সংসদ ২০২৩ সালের আইন পাশ করে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে।

সেই পরিবর্তন নিয়েই NGO Association for Democratic Reforms এবং কংগ্রেস নেত্রী জয়া ঠাকুর-সহ একাধিক আবেদনকারী সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। তাঁদের মামলার মূল প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নির্বাহী বিভাগের প্রভাব কতটা থাকা উচিত এবং ২০২৩ সালের আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলি সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

গত মাসের বিভক্ত রায়ে বিচারপতি দত্ত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিচারপতি শর্মা অবশ্য বিষয়টিকে সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর পক্ষে মত দেন। ফলে একই বেঞ্চে দুই ভিন্ন মত সামনে আসে, যদিও বৃহত্তর বেঞ্চ গঠনের জন্য নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর বিষয়ে আদালত একমত হয়েছিল।

এখন নতুন আবেদনে বিচারপতি শর্মার মত প্রত্যাহারের দাবি সেই আইনি প্রক্রিয়ায় আরও একটি প্রশ্ন যোগ করেছে—আগের বিভক্ত রায়ের পর মামলাটি কোন বেঞ্চে এবং কীভাবে এগোবে। ৭ অক্টোবরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট এই প্রত্যাহারের আবেদনটি পরীক্ষা করবে।

অর্থাৎ, CEC নিয়োগ আইন নিয়ে লড়াই এখন শুধু ২০২৩ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিয়োগ প্রক্রিয়ার কাঠামোর পাশাপাশি বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও বিচারিক স্বচ্ছতার প্রশ্নও একই মামলার পরবর্তী গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

আরও পড়ুন