ভারতে বর্ষা ঢুকে পড়লেও বৃষ্টির গতি আশানুরূপ নয়। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এর মধ্যেই Super El Nino-র সম্ভাবনা সামনে আসায় কৃষি, জলসম্পদ এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ে নতুন করে চিন্তা শুরু হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয়, কেন্দ্রের চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ ১২ রাজ্যের তালিকায় আপাতত পশ্চিমবঙ্গের নাম নেই।
জুনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশে বর্ষার ঘাটতি প্রায় ৩৫ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে খরিফ মরশুমের চাষে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদন, জলসংকট এবং বাজারদরের ওপর।
কৃষি মন্ত্রক ইতিমধ্যেই এমন ১২টি রাজ্যকে চিহ্নিত করেছে, যেখানে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হতে পারে। তালিকায় রয়েছে উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, কর্নাটক, ওড়িশা, গুজরাট, রাজস্থান, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড এবং মহারাষ্ট্র।
এই রাজ্যগুলির মোট ৩২৬টি জেলার জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কৃষকদের আগাম প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে বৃষ্টির ঘাটতির কারণে ফসলের ক্ষতি কমানো যায়।
বিশেষ করে তুলা এবং ডালজাতীয় ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, শস্য আবর্তন পদ্ধতি এবং বিকল্প ফসল চাষের পরিকল্পনাও গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য, ডাল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
এছাড়া জোয়ার, বাজরা-সহ অন্যান্য শস্যের চাষ বাড়ানোর জন্যও বিভিন্ন রাজ্যকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিশ্চিত বর্ষার পরিস্থিতিতে বহুমুখী কৃষি কৌশলই ক্ষতি কমানোর অন্যতম উপায়।
এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্র সরকার দেশের বিভিন্ন জলাধারের জলস্তর, সারের মজুত এবং কৃষিপণ্যের বাজারদর নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা করছে। কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে এবং কৃষকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
কীভাবে তৈরি হয় এল নিনো?
প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রজলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেলে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। সাধারণত তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাত্রা ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে তা নজরে আসে, আর তা যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি পৌঁছায়, তখন পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।
২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের জলের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে। জুলাইয়ের শেষে তা আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনো সাধারণত দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা দেয় এবং এর প্রভাব নয় মাস থেকে এক বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। ভারত-সহ এশিয়ার বহু দেশে এর ফলে বৃষ্টিপাত কমে যায়, খরার ঝুঁকি বাড়ে এবং কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই কারণেই Super El Nino নিয়ে বাড়তি নজর রাখছে কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার। আপাতত পশ্চিমবঙ্গ ঝুঁকিপূর্ণ রাজ্যের তালিকার বাইরে থাকলেও, বর্ষার গতিপ্রকৃতি আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতির প্রকৃত ছবি স্পষ্ট করে দেবে।
সম্পর্কিত প্রতিবেদন



