তৃণমূলের ভরাডুবির আবহে দলের অন্দরেই বাড়ছে অস্বস্তি। কাকলি ঘোষ দস্তিদারের পর এ বার ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করে জল্পনা উসকে দিলেন রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অসহনীয় নৈরাজ্যের অবসান ঘটিয়েছেন।” আর সেই পোস্ট ঘিরেই এখন তুমুল চর্চা রাজনৈতিক মহলে।
মঙ্গলবার সকালে করা ওই পোস্টে সরাসরি কারও নাম না নিলেও, তৃণমূলের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেই তা জুড়ে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। দলীয় সূত্রে খবর, ঘনিষ্ঠ মহলেও নিজের ক্ষোভ ও হতাশার কথা স্পষ্ট করেছেন বর্ষীয়ান এই সাংসদ।


সুখেন্দুশেখরের ঘনিষ্ঠদের দাবি, সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল যেখানে ২৯টি আসনে জিতেছিল, সেখানে মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে এত বড় বিপর্যয় কেন হল, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
শুধু ভোটের ফল নয়, আরজি কর আন্দোলনের সময় জনমনের ক্ষোভ বুঝতে না পারাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন সুখেন্দুশেখর। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি নাকি বলেছেন, চিকিৎসক-তরুণীর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর লক্ষ লক্ষ মানুষের পথে নামা ছিল স্পষ্ট সতর্কবার্তা। কিন্তু দল সেই বার্তা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও সরব হয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, দুর্নীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে সাধারণ মানুষ বিকল্প খুঁজতে শুরু করেছিলেন। এক ঘনিষ্ঠের কথায়, “গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়ি এখন তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের। মানুষ সব দেখেছে।”


এই সূত্র ধরেই সুখেন্দুশেখর নাকি ঘনিষ্ঠদের জানিয়েছেন, ২০১১ সালে যেমন মানুষ বামফ্রন্টকে সরাতে ভোট দিয়েছিল, ২০২৬ সালেও একই মানসিকতায় ভোট পড়েছে। সে বার লক্ষ্য ছিল সিপিএম, এ বার তৃণমূল— এমনটাই তাঁর ব্যাখ্যা বলে দাবি ঘনিষ্ঠদের।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বর্ষীয়ান এই নেতা। সাংগঠনিক কাঠামোয় বড়সড় পরিবর্তন ও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। তা না হলে আগামী দিনে দলের অস্তিত্ব আরও সংকটে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
রাজ্য রাজনীতিতে দীর্ঘ ছয় দশকের অভিজ্ঞ সুখেন্দুশেখর রায় একসময় কংগ্রেস ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন তিনি। পরে তৃণমূলে যোগ দিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন। সংবিধান ও সংসদীয় প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দলেও সমাদৃত।
তবে এটাই প্রথম নয়। আরজি কর আন্দোলনের সময়ও সমাজমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন সুখেন্দুশেখর। নেতাজি মূর্তির সামনে ধর্না দেওয়া থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে পোস্ট—সবই সে সময় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল।
এদিকে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ‘অভিমানী’ পোস্ট এবং সাংগঠনিক পদ ছাড়ার ঘটনাও এখনও তাজা। তার মধ্যেই সুখেন্দুশেখরের এই অবস্থান তৃণমূলের অন্দরে নতুন করে অস্বস্তি বাড়িয়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে
Google News এবং Google Discover-এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।



