পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর (Sujit Bose) বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টে (Calcutta High Court) চাঞ্চল্যকর দাবি করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। বুধবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে জামিনের আবেদনের শুনানিতে ইডির আইনজীবী এসভি রাজু দাবি করেন, সুজিত বসুর কাছে ৮.৮ কোটি টাকার হদিশ মিলেছে। তাঁর অভিযোগ, সুজিতের নির্দেশেই পুরসভায় বিপুল সংখ্যক অযোগ্য প্রার্থীকে বেআইনিভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টেও কোটি কোটি টাকা ঢোকার তথ্য তদন্তে পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি ইডির।
ইডির বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়, বরং পুর নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড়সড় একটি আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা। আদালতে তদন্তকারী সংস্থার তরফে দাবি করা হয়, মোট ৩৪০ জন প্রার্থীর নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ২৮৬ জনই অযোগ্য ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা করে নেওয়া হত বলেও অভিযোগ ইডির।
তদন্তকারী সংস্থার আরও দাবি, শুধু দক্ষিণ দমদম পুরসভাতেই ২৮৪টি বেআইনি নিয়োগের সন্ধান মিলেছে। অর্থাৎ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের পরিধি যথেষ্ট বড় ছিল বলেই আদালতে দাবি করেছে ইডি। এই নিয়োগের বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছিল এবং সেই অর্থের একটি অংশ সুজিত বসুর কাছে পৌঁছেছিল বলে তদন্তকারীদের বক্তব্য।
ইডির আইনজীবী আদালতে অয়ন শীলের বয়ানের কথাও উল্লেখ করেন। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, প্রার্থীদের নাম বা সুপারিশের ক্ষেত্রে সুজিত বসুর সরাসরি ভূমিকা ছিল। প্রার্থী তালিকার সঙ্গে সম্পর্কিত নথি নিতাই দত্তের বাড়ি এবং পুরসভা থেকে উদ্ধার হয়েছে বলেও আদালতে জানানো হয়।
শুধু তাই নয়, মোহিনী বোসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৫২ লক্ষ টাকা জমা পড়ার তথ্যও আদালতে তুলে ধরে ইডি। একটি ধাবা থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধারের কথাও তদন্তকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়। এই সমস্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিয়োগ দুর্নীতির অর্থনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির যোগসূত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে ইডির বক্তব্য।
তবে শুনানির সময় বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ তদন্তের প্রয়োজনে সুজিত বসুকে জেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালতের এই প্রশ্নের জবাবে ইডি জানায়, তদন্ত এখনও শেষ হয়নি এবং বেশ কিছু দিক খতিয়ে দেখা বাকি রয়েছে। ফলে জামিনের বিরোধিতা করে তদন্তের স্বার্থে আরও সময় প্রয়োজন বলে আদালতে যুক্তি দেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।
সুজিত বসুর জামিনের আবেদনের পরবর্তী শুনানি আগামী ১৭ অগস্ট। ওই দিন ইডির বক্তব্যের জবাব দেবেন সুজিত বসুর আইনজীবী। ফলে পরবর্তী শুনানিতে মামলার গতিপথ কোন দিকে যায়, সেদিকেই নজর রয়েছে রাজনৈতিক ও আইনজীবী মহলের।
পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সুজিত বসুকে ঘিরে তদন্ত অবশ্য নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে রয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী। অর্থের বিনিময়ে পুরসভায় নিয়োগের অভিযোগের সূত্র ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। নির্বাচনের সময়ও তাঁকে একাধিকবার হাজিরার নোটিস দিয়েছিল ইডি।
বিধানসভা নির্বাচনের মনোনয়ন জমা দেওয়ার দিন, অর্থাৎ গত ৬ এপ্রিল থেকে ভোটপর্বের মধ্যে একাধিকবার হাজিরার নোটিস পেয়েছিলেন সুজিত বসু। নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকার কারণ দেখিয়ে তিনি সময় চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তৃণমূলের দাবি ছিল, আদালতের নির্দেশ মেনেই ভোট চলাকালীন ইডির হাজিরা এড়িয়েছিলেন বিধাননগরের তৃণমূল প্রার্থী।
ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর তদন্তে সহযোগিতা করতে গত ১ মে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে হাজির হন সুজিত বসু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আইনজীবীও। দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের পর সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি।
এর পরেই তদন্তে আরও বড় মোড় আসে। গত ১২ মে সুজিত বসুকে প্রথমে আটক করেন তদন্তকারীরা। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই থেকে পুর নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা চলছে।
এখন কলকাতা হাই কোর্টে ইডির পেশ করা ৮.৮ কোটি টাকার দাবিই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে আদালতে ওঠা এই সমস্ত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনও বিচারাধীন এবং জামিনের শুনানির পরবর্তী পর্বেই দুই পক্ষের বক্তব্য আরও স্পষ্ট হবে।



